আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২০২২ সালে টি-২০ বিশ্বকাপ চলাকালীন অস্ট্রেলিয়ায় এক জাতীয় দলের ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তারের খবরে সেবার স্তব্ধ হয়ে যায় শ্রীলঙ্কা। ক্রিকেটপ্রেমী দেশটি যখন মাঠের ব্যর্থতা হজম করার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই শ্রীলঙ্কান অলরাউন্ডার ৩১ বছর বয়সী দানুশকা গুণতিলাকার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এবং তাঁর গ্রেপ্তার দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এই ঘটনায় শুধু একজন ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত আচরণই নয়, গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়েছে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ড (SLC) এবং তাদের দীর্ঘদিনের শিথিল শৃঙ্খলানীতি।
অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের সেক্স ক্রাইমস স্কোয়াডের কমান্ডার ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট জেন ডোহার্টির দেওয়া বিবৃতি অনুযায়ী, দানুশকার সঙ্গে এক ২৯ বছর বয়সী মহিলার পরিচয় হয় জনপ্রিয় ডেটিং অ্যাপ ‘টিন্ডার’-এ। কয়েক সপ্তাহ ধরে কথোপকথনের পর এক রাতে সিডনির অপেরা বারে প্রথমবার দেখা করেন তাঁরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, জাতীয় দলের সঙ্গে থাকার দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও দানুশকা ওই মহিলার সঙ্গে তাঁর বাসভবন রোজ বে-তে যান। শুরুতে সম্মতিতে যৌন সম্পর্ক হলেও, মহিলা কন্ডোম ব্যবহারের অনুরোধ করলে দানুশকা তা প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে তিনি ওই মহিলাকে শ্বাসরোধ করেন এবং জোর করে যৌন নির্যাতন চালান বলে অভিযোগ।
তারপর এক গভীর রাতে, যখন শ্রীলঙ্কান দল বিশ্বকাপ শেষে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই অস্ট্রেলিয়ান পুলিশ দানুশকাকে গ্রেপ্তার করে। রবিবার তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাঁর জামিন আবেদন খারিজ করে দেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার হেফাজতেই রয়েছেন।
এই ঘটনা দানুশকার জীবনে প্রথম নয়। শ্রীলঙ্কার শীর্ষ ইংরেজি দৈনিক ডেইলি মিরর-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গত দুই বছরের মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত তিনটি মহিলা সংক্রান্ত অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র জানায়, দক্ষিণ শ্রীলঙ্কায় দুটি ঘটনায় মহিলাদের উত্যক্ত করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এর মধ্যে এক ঘটনায় মিরিসার একটি নাইটক্লাব বা হোটেলে এক নারীর সঙ্গে অশোভন আচরণ করলে ওই মহিলা তাঁকে চড় মারেন বলেও অভিযোগ।
২০১৮ সালে কলম্বোর কোলুপিটিয়ায় এক নরওয়েজিয়ান মহিলার ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলায় দানুশকার নাম উঠে আসে। যদিও সেই মামলায় তাঁর সহযোগী সন্দীপ জুড সেলিয়াহ অভিযুক্ত হন, দানুশকাকে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত করা হয়নি। তবে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ড তাঁকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ছয় ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেয়।
সেই সময় বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, ম্যাচ চলাকালীন খেলোয়াড়দের মধ্যরাতের মধ্যে হোটেল রুমে ফিরতে হয় এবং কোনো অতিথি রাখা নিষিদ্ধ—যা দানুশকা মানেননি। এর আগেও, ২০১৭ সালের অক্টোবরে গভীর রাতে পার্টি করে অনুশীলন মিস করায় তাঁকে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে জবাবদিহি করতে হয়।
২০২১ সালে ইংল্যান্ড সফরে কোভিড-১৯ বায়ো বাবল ভাঙার অভিযোগে দানুশকা, কুশল মেন্ডিস ও নিরোশন ডিকওয়েলাকে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই তাঁদের সবাইকে ‘সংশোধন হয়ে গেছে’ ঘোষণা করে আবার জাতীয় দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
এত অভিযোগ, শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং বিতর্ক সত্ত্বেও কেন দানুশকাকে বারবার জাতীয় দলে রাখা হলো—এই প্রশ্নেই এখন উত্তাল শ্রীলঙ্কা। ক্রীড়া মহলের একাংশের মতে, “এতবার নাম জড়ানো একজন খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে আজীবন নিষেধাজ্ঞার কথা উঠতেই পারত।” কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, দানুশকা নিয়মিতই ব্যাকআপ খেলোয়াড় হিসেবে দলে থেকেছেন, বিদেশ সফরে গিয়েছেন এবং বোর্ডের আশীর্বাদ পেয়েছেন।
ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর দ্রুত বিবৃতি দেয় শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ড। তারা জানায়, আদালতের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং আইসিসির সঙ্গে আলোচনা করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করা হবে। বিবৃতিতে বলা হয়, “দানুশকা গুণতিলাকার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আদালতের রায় এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, দোষী প্রমাণিত হলে আমরা কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশটির জন্য এই কেলেঙ্কারি শুধু ক্রিকেটীয় লজ্জাই নয়—নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটেরও প্রতিফলন। এখন দেখার, আদালতের রায় ছাড়াও শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট কি সত্যিই আত্মসমালোচনার পথে হাঁটবে, নাকি এই ঘটনাও অতীতের মতো চাপা পড়ে যাবে।
