আজকাল ওয়েবডেস্ক: আবার সেই পুরনো ইস্টবেঙ্গল? পুনর্মুষিকভব। অস্কার ব্রুজোঁর বিদায়ের পর লাল-হলুদের নতুন অধ্যায়ের শুরুটাই হলো তাল কেটে। মরশুমের প্রথম ডার্বি, আর তাতেই ডুরান্ড কাপের মঞ্চে হার। আন্তোনিও লোপেজ হাবাসও শুরু করলেন পরাজয় দিয়ে। যে হাবাস মানেই ছিল ডার্বিতে জয় আর জয়।
অস্কারের ছেড়ে যাওয়া চেয়ারে এবার বসেছেন হাবাস। ভারতীয় ফুটবল তাঁর কাছে অচেনা নয়। এই দেশের ফুটবলের নাড়িনক্ষত্র তাঁর জানা। তাঁর পরামর্শেই দল গড়ার কাজ হয়েছে। নতুন ফুটবলার এসেছেন, নতুন পরিকল্পনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু মাঠে নেমে সেই পরিকল্পনার কোনও ছাপ দেখা গেল না প্রথম ডার্বিতে। ইস্টবেঙ্গল খেলল এমন এক ফুটবল, যেখানে ছিল না আগ্রাসন, ছিল না আত্মবিশ্বাস, ছিল না গোলের জন্য মরিয়া চেষ্টা। অন্তত প্রথমার্ধে।
অবশ্য হাবাসকে খুব বেশি সময়ও দেওয়া হয়নি। তাঁকে খুব বেশি দোষও দেওয়া যাবে না। হাতে সময় পেয়েছেন খুব কম। দলকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাননি স্প্যানিশ কোচ। নতুন ফুটবলারদের সঙ্গে বোঝাপড়া তৈরি করতেও সময় লাগবে। কিন্তু সমস্যা হল, ইস্টবেঙ্গলের মতো দলের ক্ষেত্রে শুরুটাই অনেক কিছু নির্ধারণ করে দেয়। আর সেই শুরুতেই হারের ধাক্কা সমর্থকদের মনে পুরনো আতঙ্ক ফিরিয়ে আনল, এ কথা বললেও অত্যুক্তি করা হবে না।
অথচ কয়েক মাস আগেও ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। অস্কার ব্রুজোঁর জমানায় যেন বদলে গিয়েছিল ইস্টবেঙ্গলের মানসিকতা। যে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে খেলতে নামার আগে দীর্ঘদিন ধরে জুজু তাড়া করত, সেই প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে লড়াই করতে শিখেছিল লাল-হলুদ। গতবার ডুরান্ড কাপের ডার্বিতে অস্কারের দল মোহনবাগানকে হারিয়ে দারুণ শুরু করেছিল। শিল্ডের ফাইনালে পেনাল্টি শুটআউটে মোহনবাগানের কাছে হারলেও লড়াইয়ের মানসিকতা ছিল অটুট। সুপার কাপে মোহনবাগানকে আটকে ছিটকে দিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। আইএসএলের সেই রুদ্ধশ্বাস ডার্বিতেও এগিয়ে থেকে ড্র করেছিল তারা। এরপর ইন্টার কাশীর বিরুদ্ধে জয় তুলে নিয়ে আত্মবিশ্বাসী দল হিসেবেই মরশুম শেষ করেছিল অস্কারের চ্যাম্পিয়ন ইস্টবেঙ্গল।
কিন্তু সেই দলের ভিতটাই যেন এবার নড়ে গেল। কেভিন সিবিয়ে চলে গেলেন, মিগুয়েলও থাকলেন না। কোচ অস্কার ব্রুজোঁর সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন হল। গতবারের গোল্ডেন বুট জয়ী ইউসেফ এজেজারিকেও ধরে রাখা গেল না। নতুন মুখ এসেছে, কিন্তু হারিয়ে গিয়েছে গত মরশুমের সেই লড়াকু চরিত্র। চ্যাম্পিয়ন মানসিকতার দলটাকে ধরে রাখা গেল না।
ডুরান্ডের ডার্বিতে হাবাসের ইস্টবেঙ্গলকে দেখে সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে তাদের শরীরী ভাষা। যেন ম্যাচের শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসের অভাব। গোলের সুযোগ তৈরি করার তাগিদ নেই, আক্রমণে ধার নেই। গোল খাওয়ার পর অবশ্য শেষের দিকে কিছুটা খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে দল। একাধিক গোলের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু ফিনিশিংয়ে সেই রক্তাল্পতা।
পিভি বিষ্ণুকে পরে নামালেন হাবাস। গোল হজমের পর বাধ্য হয়ে রশিদকে মাঠে আনেন তিনি। সদ্য ভারতে আসা রশিদ পুরোপুরি জেটল্যাগ কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তবুও গোল করার মতো জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি।
পুরোপুরি ফিট থাকলে হয়তো গল্পটা অন্যরকমও হতে পারত। মিগুয়েলের জায়গায় আসা দানি রামিরেজও সদ্য শহরে পা রেখেছেন। ক্লান্ত শরীর নিয়েও অল্প সময়ে নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছেন।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, বাকিরা কোথায় ছিলেন? কোথায় গেল অস্কার জমানার সেই জেদ, সেই লড়াইয়ের মানসিকতা? গতবার ডুরান্ড ডার্বিতে কেভিন সিবিয়ে যেভাবে মোহনবাগানের ম্যাকলারেনকে আটকে রেখেছিলেন, সেই দৃঢ়তা এদিন দেখা গেল না রক্ষণে। ফাঁকায় গোল করে গেলেন সাহাল।
অন্যদিকে মোহনবাগানও তাদের নতুন বিদেশি ড্র্যাজিচ ও আলবার্তোকে শুরু থেকে নামায়নি। পরিবর্ত হিসেবে ব্যবহার করেও তারা ইস্টবেঙ্গলের উপর চাপ তৈরি করে গেল।
অস্কার ব্রুজোঁ যে বীজ বুনেছিলেন, সেটাই যেন এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর সময়ে ইস্টবেঙ্গল শুধু ম্যাচ জিতত না, বিশ্বাস করত যে কোনও প্রতিপক্ষকেও হারানো যায়। সেই বিশ্বাসটাই ছিল অস্কারের সবচেয়ে বড় সাফল্য। আর সেই জায়গাতেই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
হাবাস নিঃসন্দেহে অভিজ্ঞ কোচ। সময় পেলে তিনি হয়তো বদলে দেবেন এই দল। হয়তো এই হারের জবাবও দেবেন। কিন্তু ফুটবলে শুরুটাই অনেক সময় একটা দলের মানসিকতার ছবি এঁকে দেয়। আর মরশুমের প্রথম ডার্বিতেই ইস্টবেঙ্গলের পারফরম্যান্স সমর্থকদের মনে ফিরিয়ে দিল সেই পুরনো দুঃশ্চিন্তা, আবার কি তবে পুরনো অন্ধকারে ফিরছে লাল-হলুদ?
অস্কারের ইস্টবেঙ্গল যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, হাবাসের ইস্টবেঙ্গলকে এখন সেই স্বপ্নটাকেই আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। লাল-হলুদের হেডস্যর হাবাসের সামনে এখন একটাই চ্যালেঞ্জ, এই হারের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে আবার নিজেদের নতুন করে প্রমাণ করা।
















