পিরিয়ডের সময় পেটব্যথাকে বেশিরভাগ মহিলাই স্বাভাবিক বলে মনে করেন। কিন্তু যদি ব্যথা এতটাই বেশি হয় যে অফিস, পড়াশোনা, ঘরের কাজ বা স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। কারণ এটি এন্ডোমেট্রিওসিস নামের একটি গাইনোকোলজিক্যাল সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। ঠিক কী এই রোগ? কখন লক্ষণ দেখে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন? চিকিৎসাই বা কী? সেবিষয়ে জানালেন আভা সার্জি সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ও চিফ কনসালটেন্ট ড. বাণী কুমার মিত্র।
এন্ডোমেট্রিওসিস কী
জরায়ুর ভেতরে একটি বিশেষ আস্তরণ থাকে, যাকে এন্ডোমেট্রিয়াম বলা হয়। প্রতি মাসে এই আস্তরণ তৈরি হয় এবং গর্ভধারণ না হলে ঋতুস্রাবের সময় শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু এন্ডোমেট্রিওসিসে এই ধরনের টিস্যু জরায়ুর বাইরে বেড়ে ওঠে।
এই টিস্যু ডিম্বাশয়, ফ্যালোপিয়ান টিউব, পেলভিসের বিভিন্ন অংশ, মূত্রথলি বা অন্ত্রেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। পিরিয়ডের সময় এগুলিও হরমোনের প্রভাবে ফুলে ওঠে ও রক্তক্ষরণ করে। ফলে শরীরের ভেতরে প্রদাহ, ব্যথা এবং স্কার টিস্যু তৈরি হয়।
কী কী লক্ষণ দেখা যায়
এন্ডোমেট্রিওসিসের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হল তীব্র ঋতুস্রাবের ব্যথা। তবে শুধু এটুকুই নয়, আরও কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন- পিরিয়ডের সময় অসহ্য পেট ও কোমর ব্যথা, সময়ের সঙ্গে ব্যথা বাড়তে থাকা, তলপেটে দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা থাকা, যৌন মিলনের সময় ব্যথা, প্রস্রাব বা মলত্যাগের সময় অস্বস্তি, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, পেট ফাঁপা, বমি বমি ভাব বা হজমের সমস্যা, অতিরিক্ত ক্লান্তি। অনেক মহিলা বছরের পর বছর এই সমস্যাগুলো সহ্য করেন, কারণ তারা মনে করেন এগুলো পিরিয়ডের স্বাভাবিক অংশ।
রোগ ধরা পড়তে দেরি হয় কেন
এন্ডোমেট্রিওসিসের লক্ষণ অনেক সময় গ্যাস্ট্রিক, ইউরিন ইনফেকশন বা সাধারণ পিরিয়ডের ব্যথার সঙ্গে মিলে যায়। তাই রোগটি চিহ্নিত করতে দেরি হয়। অনেক মহিলা ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সঠিক রোগ নির্ণয় ছাড়াই কষ্ট পান।
চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ শুনে, শারীরিক পরীক্ষা করে এবং আল্ট্রাসাউন্ড বা অন্যান্য ইমেজিং টেস্টের সাহায্যে রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। কিছু ক্ষেত্রে ছোট অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়।
সন্তানধারণে প্রভাব
এন্ডোমেট্রিওসিস মহিলাদের বন্ধ্যাত্বের অন্যতম কারণ। এই রোগের কারণে ডিম্বাশয় ও ফ্যালোপিয়ান টিউবের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হতে পারে। ফলে গর্ভধারণ কঠিন হয়ে যায়। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সব এন্ডোমেট্রিওসিস রোগীরই যে সন্তান হবে না, এমন নয়। অনেক নারী স্বাভাবিকভাবেই গর্ভধারণ করেন। আবার প্রয়োজন হলে ওষুধ, অস্ত্রোপচার বা আইভিএফের মতো আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির সাহায্য নেওয়া যায়।
চিকিৎসা পদ্ধতি
রোগের তীব্রতা, বয়স এবং ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। সাধারণত ব্যথা কমানোর ওষুধ, হরমোন থেরাপি এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়।
যদি সমস্যা বেশি হয় বা সন্তানধারণে বাধা তৈরি করে, তাহলে ল্যাপারোস্কোপিক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অতিরিক্ত টিস্যু অপসারণ করা হতে পারে।
কেন সচেতনতা জরুরি
অনেক মহিলা এই ব্যথাকে স্বাভাবিক ভেবে বছরের পর বছর সহ্য করেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, পিরিয়ডের সময় অসহ্য ব্যথা কখনও স্বাভাবিক নয়। তাই নিয়মিত তীব্র ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা অন্য কোনও অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সঠিক সময়ে রোগ ধরা পড়লে এন্ডোমেট্রিওসিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এতে ব্যথা কমে, জীবনযাত্রার মান উন্নত হয় এবং ভবিষ্যতে সন্তানধারণের সম্ভাবনাও অনেকটাই বজায় থাকে। তাই















