কোলে এসেছে ফুটফুটে সন্তান। বাড়ি জুড়ে খুশির হাওয়া, ফুরফুরে রোদ। নবীনতম সদস্যকে নিয়ে মেতে গোটা পরিবার। আনন্দের বান ডেকেছে নতুন মায়ের মন জুড়েও। এ যে এক অন্যরকম তৃপ্তি, এতদিন অচেনা হয়ে থাকা এক অপার্থিব মাধুর্য! কুট্টি একটা মানুষ, যার সবটুকু এই মায়ের শরীর-মন ঘিরেই।
কিন্তু যেটা কেউ মুখ ফুটে বলে না তেমন, তা হল— একেবারে নতুন এই সফরটা ঘিরে যতটা আনন্দ, যতটা উত্তেজনা, ঠিক ততটাই কিন্তু পরিশ্রম, ক্লান্তি আর অবসাদও বটে। পরিবারের খুদেতম সদস্যকে ঘিরে আমোদ-আহ্লাদের ফাঁকে বেশির ভাগ সময়েই কিন্তু চোখ এড়িয়ে যায় মায়ের চোখের নীচে জমাট বেঁধে থাকা রাতের পর রাত জাগার কালি, সম্পূর্ণ নতুন এক দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে জেরবার দশা আর জীবন পুরোপুরি বদলে যাওয়ার মনখারাপ। আর তাই নতুন মায়ের এটা মনে রাখা ভাল যে, নবজাতককে যত্নে রাখা যতটা জরুরি, ততটাই জরুরি নিজের যত্ন আর সবদিক নজরে রেখে, সামলে-আগলে এগিয়ে চলা।
কী ভাবে তা করবেন? শিশুর যত্ন আর নিজের যত্নকে সমান গুরুত্ব দিয়ে কীভাবে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে মাতৃত্বের এই নতুন সফর?
প্রসব-পরবর্তী শরীরের যত্ন
আজকাল বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রসব হয় সিজার করে। ফলে শরীরকে সারিয়ে তোলাটাও একটা কাজ। তাই সন্তানকে সময় যেমন দেবেন, তেমনই নিজের প্রয়োজনীয় বিশ্রামটাও নিতে ভুলবেন না যেন। সদ্য অস্ত্রোপচার পেরিয়ে এসেছেন। তাই ভারী জিনিস তোলা থেকে বিরত থাকুন। শরীরের আর্দ্রতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় পরিমাণে জল, ফলের রস, স্যুপ, চা পান করতে থাকুন। এই সময়টায় নিয়মিত শিশু আপনার স্তন্যপান করবে, তাই নিজের শরীরে যাতে পুষ্টির ঘাটতি না হয়, সেদিকটায় অবশ্যই খেয়াল রাখুন। প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন, মিনারেল, ফাইবারস সবই যাতে ঠিকমতো খাওয়া হয়, তার জন্য চিকিৎসকের দেওয়া ডায়েট প্ল্যান সঠিক ভাবে মেনে চলতে ভুলবেন না। মনে রাখবেন, এ সময়টায় আপনি যা খাবেন বা যেমন থাকবেন, তার প্রভাব কিন্তু শিশুর শরীরেও পড়বে। তাই যত ব্যস্ততাই থাক, নিজের শরীরটাকে সুস্থ রাখতে হবে। সন্তানের জন্য তো বটেই, নিজের জন্যও।
সদ্যোজাতের যত্ন
এ অভিজ্ঞতাটা আপনার জন্য একেবারেই নতুন। এতদিন শুনেছেন, দেখেছেন। বাড়ির বড়রা এখনও সাধ্যমতো পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু করতে তো হবে আপনাকেই। তাই মাথায় রাখুন এ বিষয়গুলো—
খাওয়াদাওয়া – যখনই আপনার বাচ্চা খেতে চাইবে, তখন স্তন্যপান করান। সাধারণ ভাবে ২-৩ ঘণ্টা অন্তর ওদের খিদে পায়। ছোট্ট মানুষের পেটটাও যে এক্কেবারে ছোট! খিদে পেলে কান্নার পাশাপাশি বাচ্চার নানা রকম আচরণেও বোঝা যায় কিন্তু। মুখে হাত দেওয়া, ঠোঁট নড়াচড়া বা চাটার মতো বিভিন্ন ইঙ্গিত প্রথম প্রথম বুঝতে না পারলে বাড়ির বড়দের সাহায্য নিন।
ঘুম – সদ্যজাতদের ঘুমের সময় তাদের খিদের উপর নির্ভর করে সাধারণত। ভরা পেটে ওরা ঘুমিয়ে পড়তে পারে বা খেলতে পারে। ঘণ্টা দুই-তিন বাদে খিদে পেলে ঠিক জেগে যায়। চেষ্টা করুন ওদের দিনের বেলা যতটা পারেন জাগিয়ে রাখতে। যাতে রাতে ঘুমোনোর সময়টা বাড়ে। এভাবেই স্লিপ সাইকেল তৈরি হয়ে যাবে আস্তে আস্তে।
পরিচর্যা – ডাক্তারবাবু বা হাসপাতাল যেভাবে দেখিয়ে দিয়েছে, সেভাবে আলতো করে ওদের স্নান, মালিশ কিংবা পরিচর্যা করুন। জেনে নিন শরীরের বিভিন্ন অংশ কীভাবে পরিষ্কার রাখতে হবে, কীভাবেই বা সাবধানে নখ কাটতে হবে। ডাক্তারবাবুর পরামর্শ মতোই সদ্যজাতের নরম শরীরের জন্য বেছে নিন সঠিক তেল বা লোশন।
শিশুকে শান্ত রাখা – কুট্টি একটা মানুষ কেঁদেকেটে বাড়ি মাথায় করছে। আবার আপনার কিংবা বাবার কোলে গেলেই চুপ! বিশেষত আপনার কোলে, বুকের কাছটিতে যেন ওর বাড়তি ওম, বাড়তি আরাম। বাচ্চা একটানা কাঁদছে? বোঝার চেষ্টা করুন কারণটা কী। দরকারে বাড়ির বড়দের সাহায্য চান। নরম কাঁথায় জড়ামড়ির সোয়াডলিং, দোল দেওয়া, ঘুমপাড়ানি গান কিংবা চুষিকাঠি ওকে শান্ত করতে পারে। নিজের ক্লান্ত লাগলে ওকে দোলনায় শুইয়ে দিতে পারেন মিনিট দশেক। বাবা কিংবা অন্য বড়দের কোলেও দিতে পারেন। কেউ কিচ্ছু মনে করবে না!
সাবধানতা – অবশ্যই সতর্ক থাকুন বাচ্চা কোথায়, কীভাবে শুয়ে আছে। অন্য কারও কোলে থাকলে, সে বাবার কোল হলেও, খেয়াল রাখুন ঠিকমতো সাবধানতা নেওয়া হয়েছে কিনা। সদ্যোজাতের ঘাড়-সহ গোটা শরীরটাই কিন্তু বড্ড নরম আর তুলতুলে থাকে। যে কোনও প্রয়োজনে, সামান্যতম অসুস্থতায় বাড়ির বড়দের এবং অবশ্যই ডাক্তারবাবুর পরামর্শ নিতে ভুলবেন না। বাচ্চার যাবতীয় ওষুধপত্র, চিকিৎসক, ক্লিনিক বা হাসপাতালের ফোন নম্বর হাতের কাছে রাখুন।
নিজের ঘুম ও বিশ্রাম
প্রতিদিনের সবটুকু সময় এখন সন্তানকে ঘিরেই কাটবে। সদ্যোজাত জেগে থাকে বলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই দিনগুলোতে মায়েদের ঘুমের বারোটা বাজে। কিন্তু ঘুমোতেও তো হবে! না হলে ক্লান্তির পাশাপাশি অসুস্থতাও আসতে কতক্ষণ! তাই সন্তান যখন যেটুকু ঘুমোচ্ছে, আপনিও বরং চেষ্টা করুন একটু ঘুমিয়ে নিতে। নিদেনপক্ষে শুয়ে বিশ্রাম নিন। রাতে দরকারে আপনি এবং নতুন বাবা কিংবা বাচ্চার ন্যানি থাকলে পালা করে রাত জাগুন। এতে ক্লান্তির পরিমাণ কিছুটা হলেও তো কমবে। আর বিশ্রাম হলে আপনিও খানিকটা তরতাজা থাকতে পারবেন।
মনের যত্ন
পোস্টপারটাম ডিপ্রেশন নিয়ে যতই বেশির ভাগ মা মুখে কুলুপ আঁটুক, এটা কিন্তু অস্বীকার করার নয়। আপনার এতদিনকার জীবনটা আমূল পাল্টে যাচ্ছে। এখন যা কিছু হবে আপনার জীবনে, সবটাই ছোট্ট মানুষটার চাহিদা এবং প্রয়োজন মাথায় রেখে— তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কিন্তু ততটাও সহজ নয়। তাই লাগাতার অবসাদ টের পেলে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন, প্রয়োজনে কাউন্সেলিং করান। নিজের সদ্যোজাতকে যত্ন করতে করতেই বাড়ির সবার সঙ্গে গল্প করুন, গান শুনুন, আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবরা বাড়িতে এলে তাদের সঙ্গে দেখা করে আসুন, বাচ্চা ঘুমোলে এবং আপনার ঘুম না পেলে গল্পের বই পরুন, ওটিটি দেখুন বা ফোনে কথা বলুন। সন্তান মাস দুই-তিন পেরোলে আস্তে আস্তে আত্মীয়দের বাড়ি যাওয়া-আসা করতে পারেন চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে। মন ভাল রাখাটা বড্ড জরুরি কিন্তু!
নতুন মা। নতুন সফর। যত্ন হোক তার নিত্যসঙ্গী!















