বর্ষা মানেই প্রকৃতির নতুন রূপ। টিপটিপ বৃষ্টি, মাটির সোঁদা গন্ধ আর চারপাশের সবুজে ভরে ওঠে মন। তবে যতই মনোরম হোক, এই ঋতুর সঙ্গে হানা দেয় নানা অসুখ-বিসুখ। শুধু মানুষ নয়, পোষ্যদের জন্যও বর্ষাকাল নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। বৃষ্টি, আর্দ্রতা, কাদা ও জমে থাকা জল মিলিয়ে বর্ষায় পোষ্যদের মধ্যে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অনেক সময় সামান্য অসাবধানতাও বড় ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে পারে। বৃষ্টির মরশুমের শুরু থেকেই কীভাবে পোষ্যর যত্ন নেবেন? সেবিষয়ে পরামর্শ দিলেন অ্যানিমাল হেলথ প্যাথলজি ল্যাবের সিইও প্রদীপ চক্রবর্তী। 

টিক-বাহিত রোগ

বর্ষাকালে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় টিক-বাহিত রোগ। বৃষ্টির সময়ে ঘাস, ঝোপঝাড় ও ভেজা পরিবেশে টিক দ্রুত বংশবিস্তার করে। এই টিকের কামড় থেকে এরলিকিওসিস, বেবেসিওসিস, অ্যানাপ্লাজমোসিস এবং হেপাটোজুনোসিসের মতো গুরুতর রোগ হতে পারে। আক্রান্ত পোষ্যের জ্বর আসে, দুর্বলতা দেখা দেয়, খাওয়ার ইচ্ছা কমে যায় এবং রক্তশূন্যতার সমস্যাও তৈরি হতে পারে।

লেপ্টোস্পাইরোসিস

বর্ষায় জমে থাকা জল এবং ইঁদুরের মূত্রের মাধ্যমে লেপ্টোস্পাইরোসিস ছড়ায়। এটি এমন একটি রোগ যা প্রাণীর থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হতে পারে। আক্রান্ত পোষ্যের জ্বর, বমি, জন্ডিস এবং কিডনির সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই পোষ্যকে নোংরা জল জমা এলাকায় যেতে না দেওয়াই ভাল। 

মশাবাহির রোগ

বর্ষার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে মশার উপদ্রবও। ফলে কিছু এলাকায় হার্টওয়ার্ম রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। আক্রান্ত মশার কামড়ের মাধ্যমে এই পরজীবী শরীরে প্রবেশ করে হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসে ক্ষতি করতে পারে। পোষ্যর বারবার কাশি, দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া, খেলাধুলা বা হাঁটাচলায় অনীহা, শ্বাসকষ্ট, ওজন কমে যাওয়া, খিদে কমে যাওয়া, গুরুতর ক্ষেত্রে হৃদযন্ত্রের সমস্যা হতে পারে। এই ধরনের সমস্যা দীর্ঘদিন থাকলে অবশ্যই পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

পেটের অসুখ ও ডায়রিয়া

শুধু সংক্রামক রোগই নয়, বর্ষায় পোষ্যদের পেটের সমস্যাও বেড়ে যায়। বৃষ্টির সময় খাবার ও পানীয় জলে সহজেই জীবাণু জন্মাতে পারে। দূষিত খাবার বা জল খেলে গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস, ডায়রিয়া এবং বমির সমস্যা দেখা দেয়। শরীরে জলশূন্যতাও হতে পারে, যা ছোট প্রাণীদের ক্ষেত্রে মারাত্মক আকার নিতে পারে। পাশাপাশি ভেজা মাটি ও অপরিষ্কার পরিবেশের কারণে অন্ত্রের কৃমি সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ে। তাই এই সময় পোষ্যদের খাবার ও পানীয় জল পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

ত্বকের রোগ

ভেজা লোম ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে বর্ষাকালে পোষ্যদের ত্বকের নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ফাঙ্গাল সংক্রমণ, হট স্পট, অ্যালার্জিক ডার্মাটাইটিস, ইস্ট ইনফেকশন-এর ঝুঁকি বাড়ে। যার লক্ষণ হিসেবে পোষ্যর চুলকানি, লালচে দাগ, ত্বকে ক্ষত এবং দুর্গন্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

কানের সংক্রমণ

বর্ষাকালে কানের ভেতরে আর্দ্রতা জমে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে লম্বা কানওয়ালা কুকুরদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। পোষ্যর কান চুলকানো, মাথা ঝাঁকানো, দুর্গন্ধ এবং কানের ভেতর লালভাব দেখলে সতর্ক হন।

ভাইরাসজনিত রোগের আশঙ্কা

টিকা না নেওয়া বাচ্চা কুকুর ও বিড়ালের ক্ষেত্রে বর্ষায় কিছু ভাইরাল রোগের ঝুঁকি বেশি থাকে।ক্যানাইন পারভোভাইরাস সংক্রমণ, ক্যানাইন ডিস্টেম্পার, ফেলাইন প্যানলিউকোপেনিয়া এর মতো রোগ অনেক সময় প্রাণঘাতীও হতে পারে। তাই সময়মতো টিকা দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।

খেয়াল রাখুন

* নিয়মিত টিক ও ফ্লি নিয়ন্ত্রণ করুন।
* সময়মতো টিকাকরণ করান।
* নির্ধারিত সময় অন্তর কৃমিনাশক ওষুধ দিন।
* বৃষ্টিতে ভিজে গেলে শরীর, পা ও কান ভালভাবে শুকিয়ে দিন।
* পোষ্যকে পরিষ্কার খাবার ও পানীয় জল খেতে দিন।
* পোষ্যর চলাফেরার জন্য কাদা, জমা জল এবং নোংরা পরিবেশ এড়িয়ে চলুন।
* নিয়মিত পশুচিকিৎসকের কাছে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান এবং অসুস্থতার কোনও লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরামর্শ নিন।

সচেতনতাই সুরক্ষার চাবিকাঠি


বর্ষাকাল পোষ্যদের জন্য আনন্দের সময় হলেও এই মরশুমে রোগের ঝুঁকিও অনেক বেশি থাকে। সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে আপনার প্রিয় কুকুর বা বিড়ালকে সুস্থ, নিরাপদ ও প্রাণবন্ত রাখা সম্ভব। মনে রাখবেন, প্রতিরোধই সুরক্ষার মূলমন্ত্র। তাই বর্ষার শুরু থেকেই পোষ্যের যত্নে বাড়তি নজর দিন।