বাইরে পড়তে যাবে ছেলে কিংবা মেয়ে। অথবা চাকরিসূত্রে কাউকে থাকতে হবে বহুদূরে। বাড়ির লোকের চিন্তার শেষ নেই। কী খাবে, কী করবে, কী করেই বা সব সামলাবে— ভেবে ভেবে ঘুম ওড়ে।

আসলে সে সব হয়তো হয়েই যায় ঠিক ঠিক। বরং অনেকখানি ভাবনা ঘিরে ধরে একলা জীবন কাটাতে চলা মানুষটাকে। এই মোবাইলে ডুবে থাকা দুনিয়ায় ইদানীং তো চেনা পরিসরেও বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো বাস। সেখানে বাড়ি থেকে, চেনা বৃত্ত থেকে দূরে অচেনা কোথাও গিয়ে পড়ার জ্বালা কি কম নাকি! এমনিতেই কাছের মানুষদের সংস্পর্শে থাকতে না পেরে ঘিরে ধরে মন খারাপ। বিপদে-আপদে কাকে পাশে পাওয়া যাবে, তা নিয়েও থাকে অজানা আশঙ্কার ছায়া। তবু যেতে যখন হবেই, তখন এই লড়াইগুলোতেও জিততে হবে বইকি!

তার চেয়ে বরং জেনে রাখা যাক, কী করে ভাল রাখবেন একাকী মনকে। আর কী করেই বা প্রবাসে একলা জীবনে দিন কাটবে নিরাপদে।

মনের যত্ন নিন
মন আর মাথার তো চিরকালের যুদ্ধ। মাথা জানে পড়াশোনা বা চাকরির প্রয়োজনে বাড়ি থেকে এই দূরে থাকাটা কতটা জরুরি। তবু মন কি আর মানতে চায়? মনকে বশে রাখতে যা যা করতে পারেন:
•    নতুন জায়গায় যতটা পারেন মিশে দেখুন নতুন মানুষদের সঙ্গে। প্রতিবেশী, পাড়ার মানুষ, সহপাঠী, সহকর্মী, কিংবা নিছক পথেঘাটে, দোকানপাটে আলাপ হওয়া মানুষ— সে যে-ই হোক না কেন! কে বলতে পারে, তাদের মধ্যেই হয়তো পেয়ে যাবেন মনের মতো বন্ধু। একটা সোশ্যাল সার্কল তৈরি হয়ে গেলে কিন্তু ততটাও খারাপ লাগবে না। 
•    ছবি আঁকতে বা গান শুনতে ভালবাসেন? লিখতে বা বই পড়তে? রাঁধতে কিংবা বাগান করতে? বাড়িতে ফিরে যে সময়টা একেবারে একা পড়ে যান, সে সময়টায় এই ভাল লাগাগুলোকেই বরং সময় দিয়ে দেখুন একটুখানি। মন্দ লাগবে না। 

•    নতুন যে শহরটায় গিয়েছেন, সেখানেই বরং খুঁজে নিন পছন্দসই ক্যাফে, বাজার, লাইব্রেরি কিংবা ইন্টারঅ্যাকটিভ হবি ক্লাব। অচেনা মানুষদের আলাপ জমিয়ে দেখতেই পারেন। আর হ্যাঁ, সরকারি যানবাহনে চড়ুন, চায়ের দোকানে বসুন। শহরটাকে, তার মানুষগুলোকে আরও একটু ভাল করে চিনতে পারবেন। 

•    একটা নতুন জায়গায় গিয়ে পড়লে সেখানটা একটু ঘুরেফিরে বেড়াতে কার না ভাল লাগে! কাউকে যদি না-ই পেলেন, না হয় একা একাই বেরিয়ে পড়ুন। শহরটাকে চষে ফেলুন আগে, তারপর তার আশপাশে থাকা ট্যুরিস্ট স্পট কিংবা অফবিট জায়গাগুলো। সোলো ট্রিপে একটা নতুন জায়গার পাশাপাশি নিজের সঙ্গেও সময় কাটানো হয় অনেকক্ষণ। অচেনা শহরটা কিন্তু এভাবেই নিজের হয়ে উঠতে পারে!

•    বাড়ির লোক বা ফেলে আসা বন্ধুদের মিস করছেন খুব? ভিডিয়ো কল আছে কী করতে? বাড়ির লোকেদের সঙ্গে না হয় রোজ, যখন খুশি কথা বলা যায়। কিন্তু বন্ধুরা তো আপনার মতোই ব্যস্ত। তা হলে তাদের সঙ্গে প্ল্যান করে সপ্তাহ বা মাসের একটা নির্দিষ্ট দিন ভিডিয়ো কলের জন্য তুলে রাখবেন নাকি?

•    বড্ড একা লাগছে? মনের মধ্যে অবসাদ বাসা বাঁধার আগেই বরং যত্ন নিন। রোজ নিয়ম করে শরীরচর্চা করুন। নির্দিষ্ট সময় দিন ডিপ ব্রিদিং বা মেডিটেশনে। বাড়িতে একা থাকার সময়গুলোতে গান বা পডকাস্ট শুনুন। নিয়মিত বিষণ্ণতা দেখা দিচ্ছে বা মনোযোগের সাংঘাতিক অভাব ঘটছে বুঝলে দেরি করবেন না। থেরাপিস্টের পরামর্শ নিন। একলা জীবনে মানসিক স্বাস্থ্য কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্ব দাবি করে। 

একলা থাকার অভ্যেস
প্রবাসে একা থাকতে হলে নিজের সুরক্ষার দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়। মাথায় রাখতে হয় বিপদ-আপদ সামলে নেওয়ার পথগুলোও। যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন—
•    বাড়ি থেকে বেরোনোর সময়ে অবশ্যই দেখে নিন জানলা-দরজা, গ্যাস, ইলেকট্রিকাল বা ইলেকট্রনিক গ্যাজেট ঠিকমতো বন্ধ করেছেন কিনা। 
•    বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাড়ির দরজা ঠিকমতো তালাবন্ধ করুন। 
•    নতুন শহরের পথঘাট, নিয়মকানুন, নিরাপত্তার বিষয়ে ভাল করে খোঁজখবর নিন। স্থানীয়রা এ বিষয়ে সাহায্য করতে পারবেন। 
•    বাড়িতে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র মজুত রাখুন সবসময়ে।
•    জেনে রাখুন স্থানীয় থানা, নিকটবর্তী হাসপাতাল, ওষুধের দোকান এবং গ্রসারি দোকান, খাবারের হোম ডেলিভারির ঠিকানা ও ফোন নম্বর।
•    বাড়ির কাজকর্ম করার জন্য যদি কাউকে নিয়োগ করেন, তাঁর পরিচয় বা ঠিকানার তথ্য যাচাই করে নিন পারলে। অবশ্যই নিয়ে রাখুন পরিচয়পত্র।
•    আপৎকালীন পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে নগদ টাকার একটা ফান্ড তৈরি করে রাখুন।
•    বাড়িতে ঢোকার বাড়তি একটা চাবি দিয়ে রাখুন বিশ্বাসভাজন কাউকে।
•    নতুন জায়গায় সোশ্যাল সার্কলের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক বজায় রাখুন। বিপদে পড়লে তারাই কিন্তু সবার আগে পাশে দাঁড়াবে। 
•    বিপদে বা আপৎকালীন পরিস্থিতিতে বাড়িতে যোগাযোগের মতো নিকটজনের ফোন নম্বর দিয়ে রাখুন প্রতিবেশী এবং সহপাঠী বা সহকর্মীদের। 

একা থাকা মানেই খারাপ থাকবেন, এমনটা মোটেই নয়। ভাল থাকার, নিরাপদে থাকার চাবিকাঠি কিন্তু আপনার হাতেই!