ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ, যা শুধু রক্তে শর্করার মাত্রাই বাড়ায় না, ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গেরও ক্ষতি করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে চোখ, কিডনি, হৃদযন্ত্র এবং পায়ের ওপর।

চিকিৎসকদের মতে, ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের পায়ের যত্নে সামান্য অবহেলাও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। কারণ দীর্ঘদিন সুগার বেশি থাকলে স্নায়ু এবং রক্তনালির ক্ষতি হয়। ফলে পায়ে কোনও সমস্যা হলেও অনেক সময় রোগী তা টের পান না।

সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হল পায়ে ঝিনঝিনি ধরা, অবশ লাগা বা জ্বালাপোড়া হওয়া। অনেকের আবার মনে হয় পায়ে সূচ ফোটার মতো অনুভূতি হচ্ছে। এগুলি স্নায়ুর ক্ষতির ইঙ্গিত হতে পারে। অনুভূতিশক্তি কমে গেলে কোথাও কেটে গেল, ফোসকা পড়ল বা পায়ে কাঁটা ফুটলেও তা বুঝতে দেরি হয়। পরে সেই ক্ষত থেকেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের পায়ের ত্বকও অনেক সময় খুব শুষ্ক হয়ে যায়। গোড়ালি ফেটে যায়, চামড়া উঠতে থাকে। এই ফাটা জায়গা দিয়ে জীবাণু শরীরে ঢুকে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। তাই পায়ের ত্বক সবসময় পরিষ্কার ও আর্দ্র রাখা জরুরি।

যদি পায়ে ছোট কোনও ঘা বা ক্ষত তৈরি হয় এবং কয়েকদিন পরেও তা না শুকোয়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। কারণ ডায়াবেটিসের কারণে রক্ত চলাচল কমে গেলে ক্ষত সারতে অনেক বেশি সময় লাগে। সময়মতো চিকিৎসা না করলে সেই ক্ষত বড় আকার নিতে পারে এবং আলসার তৈরি হতে পারে।

পা লাল হয়ে যাওয়া, ফুলে যাওয়া, ব্যথা, দুর্গন্ধ, পুঁজ বের হওয়া বা ত্বকের রং কালচে হয়ে যাওয়া— এগুলিও গুরুতর সতর্কবার্তা। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা প্রয়োজন। দেরি হলে সংক্রমণ এতটাই বাড়তে পারে যে অস্ত্রোপচার বা বিরল ক্ষেত্রে পায়ের কোনও অংশ কেটে ফেলতেও হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রত্যেকেরই প্রতিদিন নিজের পা ভাল করে পরীক্ষা করা উচিত। আয়নার সাহায্যে পায়ের তলা দেখুন বা পরিবারের কারও সাহায্য নিন। কোথাও কাটা, ফোসকা, ফোলা বা রং পরিবর্তন হয়েছে কিনা খেয়াল রাখুন।

প্রতিদিন হালকা গরম জল দিয়ে পা ধুয়ে ভালভাবে শুকিয়ে নিন। এরপর ময়েশ্চারাইজার লাগাতে পারেন, তবে আঙুলের ফাঁকে নয়। খালি পায়ে হাঁটবেন না। সবসময় নরম ও সঠিক মাপের জুতো পরুন এবং পরিষ্কার মোজা ব্যবহার করুন। নিয়মিত নখ কাটুন, তবে খুব ছোট করে বা কোণ কেটে নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা। নিয়মিত ওষুধ খাওয়া, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, শরীরচর্চা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে ডায়াবেটিসজনিত পায়ের সমস্যার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

মনে রাখবেন, ডায়াবেটিসে পায়ের ছোট্ট সমস্যাকেও কখনও হালকাভাবে নেবেন না। সময়মতো চিকিৎসা ও নিয়মিত যত্নই আপনার পা সুস্থ রাখতে এবং বড় জটিলতা এড়াতে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।