বর্তমান সময়ে কাজল মূলত একটি সাধারণ প্রসাধনী হিসেবে পরিচিত। চোখে সামান্য কাজল পরলেই সাজের রূপ বদলে যায়। কিন্তু প্রাচীন ভারতে কাজলের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। এটি শুধু সাজগোজের জন্য নয়, চোখের সুরক্ষা, স্বাস্থ্যরক্ষা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত ছিল।


ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় ৪ হাজার বছর আগে সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকে ভারতীয়রা কাজল ব্যবহার করতেন। সেই সময় নারী-পুরুষ উভয়েই কাজল পরতেন। এমনকি ছোট শিশুদের চোখেও কাজল লাগানো হত। আয়ুর্বেদে কাজলকে 'অঞ্জন' নামে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্রে এটি চোখের যত্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হত।


আগে বাজারের তৈরি কাজল ছিল না। ঘরেই কাজল তৈরি করা হত। সাধারণত ঘি বা ক্যাস্টর অয়েলের প্রদীপ জ্বালিয়ে তার কালো ধোঁয়া সংগ্রহ করা হত। সেই কালো কালি বা সুটের সঙ্গে কর্পূর, চন্দন, গোলাপজল কিংবা অন্যান্য ভেষজ উপাদান মিশিয়ে কাজল বানানো হতো। বিশ্বাস করা হত, এই কাজল চোখকে ঠান্ডা রাখে এবং বিভিন্ন চোখের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে।


প্রাচীন ভারতে তীব্র রোদ, ধুলাবালি এবং গরম আবহাওয়া ছিল নিত্যসঙ্গী। সে সময় সানগ্লাসের মতো আধুনিক কোনও ব্যবস্থা ছিল না। তাই অনেকেই মনে করতেন, কাজলের কালো স্তর চোখকে সূর্যের তীব্র আলো থেকে কিছুটা রক্ষা করে। পাশাপাশি এটি ধুলাবালি ও বাইরের ময়লা চোখে ঢোকা কমাত।


কাজলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতীয় সমাজের বহু পুরনো বিশ্বাসও। অনেক পরিবারে এখনও নবজাতক শিশুর কপালে বা চোখের পাশে একটি ছোট কাজলের টিপ দেওয়া হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এটি শিশুকে কুদৃষ্টি বা ‘নজর’ থেকে রক্ষা করে। একই কারণে অনেক বড়রাও চোখে কাজল ব্যবহার করতেন।


ভারতীয় সংস্কৃতিতে কাজল সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবেও বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। বিভিন্ন পুরাণ, সাহিত্য এবং লোকগানে সুন্দর চোখের বর্ণনায় কাজলের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিয়ের সাজে আজও কাজল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কনের চোখে গাঢ় কাজল তার সৌন্দর্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে


আধুনিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ঐতিহ্যবাহী কাজলে ব্যবহৃত কিছু প্রাকৃতিক উপাদানে চোখের আরাম দেওয়ার গুণ থাকতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, বর্তমানে বাজারে পাওয়া সব কাজল সমান নিরাপদ নয়। তাই ভাল মানের এবং পরীক্ষিত পণ্য ব্যবহার করা উচিত।