অনেকেই মনে করেন, রাতে ৫-৬ ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিলেই যথেষ্ট। আবার কেউ ভাবেন, সপ্তাহের দিনগুলোতে কম ঘুমিয়ে ছুটির দিনে বেশি ঘুমালেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, বিষয়টি এত সহজ নয়। শুধু কত ঘণ্টা ঘুমোচ্ছেন তা নয়, ঘুমের মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পেলে ধীরে ধীরে তার প্রভাব পড়তে শুরু করে মস্তিষ্ক, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, হরমোন, এমনকি হজমের ওপরও। এমনই পাঁচটি সাধারণ লক্ষণ রয়েছে যা দেখলে বুঝতে হবে আপনার শরীর পর্যাপ্ত ঘুম পাচ্ছে না। 

১. কফি বা চা ছাড়া কাজই করতে পারছেন নাঃ সকালে ঘুম ভাঙতেই কফি দরকার, অফিসে পৌঁছে আবার এক কাপ, বিকেলে ক্লান্ত লাগলেই আরও এক কাপ-এমন অভ্যাস যদি তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে সতর্ক হোন। চিকিৎসকদের মতে, ক্যাফেইন সাময়িকভাবে ঘুমের ভাব কমিয়ে দেয়। ফলে কিছু সময়ের জন্য সতেজ মনে হলেও শরীরের আসল ক্লান্তি কিন্তু দূর হয় না। বরং অতিরিক্ত কফি খাওয়ার ফলে রাতে আবার ঠিকমতো ঘুম আসে না। 

২. হঠাৎ মিষ্টি বা জাঙ্ক ফুড খাওয়ার ইচ্ছা বেড়ে যাওয়াঃ রাতে ভাল ঘুম না হলে পরের দিন অনেকেরই বারবার মিষ্টি, চকোলেট, পিৎজা, বার্গার বা ভাজাভুজি খেতে ইচ্ছে করে। এটি কেবল মনের খেয়াল নয়, এর পিছনে রয়েছে হরমোনের ভূমিকা। কম ঘুম হলে শরীরে খিদে বাড়ানো হরমোন ঘ্রেলিন বেড়ে যায় এবং পেট ভরা অনুভূতি দেওয়া লেপটিন কমে যায়। ফলে বেশি ক্যালোরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে। ফলে শুধু ওজনই বাড়ে না, দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।

৩. ছোটখাটো অসুখও বারবার হচ্ছেঃ আগে বছরে একবার সর্দি-কাশি হতো, এখন প্রায় মাসে মাসেই অসুস্থ হচ্ছেন? এর কারণ হতে পারে ঘুমের অভাব। আমাদের শরীর যখন ঘুমায়, তখন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ার কাজ চলে। ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য শরীর বিভিন্ন প্রতিরক্ষামূলক কোষ তৈরি করে। কিন্তু পর্যাপ্ত ঘুম না হলে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণেও সহজে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় এবং সুস্থ হতেও বেশি সময় লাগে।

৪. সব সময় মাথা ঝিমঝিম করছে, কিছুতেই মন বসছে নাঃ অফিসে কাজ করতে গিয়ে ভুল হচ্ছে, পড়াশোনায় মন বসছে না, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বারবার ভুলে যাচ্ছেন-এসবও ঘুমের ঘাটতির লক্ষণ হতে পারে। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের সমস্ত তথ্য গুছিয়ে রাখে এবং স্মৃতিশক্তিকে জোরদার করে। তাই পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ কমে যায়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয় এবং চিন্তাভাবনাও ধীর হয়ে যায়। অনেকেই একে সাধারণ ক্লান্তি মনে করে অবহেলা করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে কর্মক্ষমতাও কমে যেতে পারে।

৫. অল্পতেই রেগে যাচ্ছেন বা বিরক্ত লাগছেঃ কেউ সামান্য কিছু বললেই রাগ হচ্ছে? ছোটখাটো বিষয়েও ধৈর্য হারিয়ে ফেলছেন? এর কারণও হতে পারে কম ঘুম। ঘুমের অভাব হলে মস্তিষ্কের যে অংশ আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, তার কার্যক্ষমতা কমে যায়। ফলে মানুষ সহজেই বিরক্ত, উদ্বিগ্ন বা হতাশ হয়ে পড়তে পারেন। শুধু তাই নয়, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং বিষণ্নতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

ঘুম মানেই শরীর বিশ্রাম নিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে ঘুমের সময়ই শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর অনেকটাই সম্পন্ন হয়। যেমন মস্তিষ্ক স্মৃতি সংরক্ষণ করে, ক্ষতিগ্রস্ত কোষ মেরামত হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হয়, হরমোনের ভারসাম্য বজায় থাকে, হৃদযন্ত্র ও রক্তনালি বিশ্রাম পায়, শরীরের শক্তি পুনরুদ্ধার হয়, হজম ও বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কত ঘণ্টা ঘুম দরকার? বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ভাল মানের ঘুম প্রয়োজন। তবে শুধু ঘণ্টা গুনলেই হবে না। যদি মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়, জোরে নাক ডাকেন, শ্বাস আটকে আসে বা সকালে উঠে ক্লান্ত লাগে, তাহলে ঘুমের মান ভালো নয় বলেই ধরে নেওয়া যায়।