আজকাল ওয়েবডেস্ক: বুধবার দুপুর ১২টা নাগাদ আর পাঁচটা দিনের মতোই তারাতলার ওই চার তলার নির্মীয়মান গোডাউনটিতে কাজ করছিলেন বেশ কিছু শ্রমিক। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে সেই ব্যস্ততা বদলে গেল এক মর্মান্তিক আর্তনাদে। তাসের ঘরের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল সম্পূর্ণ লোহার ছাদ এবং ভারী বিম। ঘটনার পর ২৪ ঘণ্টা অতিক্রান্ত হলেও এখনো লোহার চাঁই ও কংক্রিটের নিচে কতজন শ্রমিক আটকে রয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। সারারাত ধরে চলার পর বৃহস্পতিবার সকালেও উদ্ধারকাজ জারি ছিল। কিন্তু দুপুরের পর থেকেই কলকাতার আকাশ জুড়ে শুরু হওয়া মুষলধারে বৃষ্টি, ঘন মেঘের অন্ধকার এবং মুহুর্মুহু বজ্রপাতের কারণে আপাতত উদ্ধারকাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন উদ্ধারকারীরা।
স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকাল থেকেই গোডাউনটির মূল লোহার কাঠামোটি অস্বাভাবিকভাবে নড়ছিল। সেই গলদ খতিয়ে দেখতে এবং কাঠামোটির অবস্থা পরীক্ষা করতেই ছাদের ওপরে ও নিচে জড়ো হয়েছিলেন বেশ কয়েকজন শ্রমিক। আর ঠিক তখনই ঘটে যায় এই মারাত্মক দুর্ঘটনা। লোহার ভারী কাঠামোর নিচে মুহূর্তের মধ্যে চাপা পড়ে যান কর্মরত শ্রমিকরা।
ঘটনাস্থলের পাশের একটি পোক্ত চায়ের গুদামে কাজ করেন এক প্রত্যক্ষদর্শী। বৃহস্পতিবার দুপুরে সেই গুদামের ছাদ থেকে নির্মীয়মান গোডাউনটির ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে তিনি আশঙ্কাপ্রকাশ করে বলেন, “ভেতরে এখনো অনেক মানুষ আটকে আছেন। অনেকেই কাজ করছিলেন সেখানে। বিহার, ঝাড়খণ্ড কিংবা মুর্শিদাবাদ থেকে রুজি-রুটির টানে আসা বহু মহিলাও ওই গোডাউনে কাজ করতেন। চায়ের দোকানে প্রায়ই তাঁদের সঙ্গে দেখা হতো। তাঁরা এখন কী অবস্থায় আছেন, কেউ বলতে পারছে না।” সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিচিত ও স্বজনদের ভিড় বাড়ছে ঘটনাস্থল, স্থানীয় থানা এবং হাসপাতালগুলির সামনে।
ভেতরের পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে আটকে থাকা মানুষদের বেঁচে থাকার আশা ও সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হচ্ছে বলে মনে করছেন উদ্ধারকাজে যুক্ত কর্মীরা। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ চালাতে নামানো হয়েছে রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, এনডিআরএফ (NDRF), সেনাবাহিনী এবং কলকাতা পুলিশকে। কংক্রিটের ও লোহার ভারী অংশ সরানোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে হাইড্রোলিক এক্সকাভেটর এবং ব্রেকার মেশিন। তবে দুপুরের পর নেমে আসা আচমকা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই বিপুল পরিমাণ ধ্বংসস্তূপ সরাতে আর কতদিন সময় লাগবে, তা নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছে প্রশাসন।
তারাতলা কাণ্ড নিয়ে রাজ্যজুড়ে তোলপাড়ের মাঝেই বৃহস্পতিবার বিধানসভায় দাঁড়িয়ে এই দুর্ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, ধ্বংসস্তূপ থেকে এখনও পর্যন্ত মোট ২৯ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯। এর মধ্যে ৫ জনের মৃতদেহ ইতিমধ্যেই ময়নাতদন্ত শেষ করে তাঁদের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
মৃত ও আহতদের পরিবারের জন্য রাজ্য সরকারের তরফ থেকে আর্থিক সাহায্যও ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিধানসভায় তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “অর্থ দিয়ে মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ হয় না, এটা স্বীকার করেও দায়িত্বশীল সরকার তার দায়িত্ব পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ।” মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, নিহতদের পরিবার পিছু ১০ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ১ লক্ষ টাকা করে আর্থিক অনুদান প্রদান করবে রাজ্য সরকার। এর পাশাপাশি তিনি জানান, দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই সরকারের বিভিন্ন দপ্তর উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং ক্যাবিনেটের মন্ত্রীরা সহ সরকারের প্রতিনিধিরা প্রতি মুহূর্তে হাসপাতাল, উদ্ধারকার্য ও সমন্বয় বজায় রাখতে ময়দানে উপস্থিত রয়েছেন।
তারাতলার এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৃহস্পতিবার এক বার্তায় কলকাতার এই ঘটনাটিকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ বলে উল্লেখ করে তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। একই সাথে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিল (PMNRF) থেকেও এই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।















