আজকাল ওয়েবডেস্ক: রাজ্য রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর মোড়। তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী সাংসদ ডক্টর কাকলি ঘোষ দস্তিদারের একটি চিঠি ঘিরে এখন তোলপাড় নবান্ন থেকে শুরু করে গোটা রাজনৈতিক মহল। গত ২ জুলাই ২০২৬ তারিখে লেখা এবং ৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে রিসিভড হওয়া এই চিঠিতে সরাসরি রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হস্তক্ষেপ দাবি করা হয়েছে। চিঠির মূল বিষয়বস্তু হল ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের সেই ঐতিহাসিক ও মর্মান্তিক পুলিশ ফায়ারিংয়ের ঘটনায় শহীদদের জন্য দীর্ঘপ্রতীক্ষিত ন্যায়বিচার।
চিঠিতে বারাসাতের সাংসদ অত্যন্ত কড়া ভাষায় তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার এবং পরবর্তীকালে ক্ষমতায় আসা মমতা ব্যানার্জির সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই কলকাতার এসপ্ল্যানেডে এক শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে ১৩ জন নিরীহ যুব কংগ্রেস কর্মী প্রাণ হারিয়েছিলেন। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যোতি বসুর নির্দেশে এই দমনপীড়ন চলেছিল এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও বিমান বসুর মতো প্রবীণ বাম নেতারা সেই নীতি নির্ধারণের অংশ ছিলেন। ২০১৪ সালের বিচারপতি সুশান্ত চ্যাটার্জি কমিশনের রিপোর্টের প্রসঙ্গ টেনে তিনি উল্লেখ করেন, কমিশন এই ঘটনাকে 'অযাচিত, অসংবিধানিক এবং অপ্রয়োজনীয়' বলে আখ্যা দিয়েছিল এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে একে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের চেয়েও ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছিল।
সবচেয়ে বড় চমক লেগেছে যেখানে কাকলি ঘোষ দস্তিদার নিজের দলের পূর্বতন সরকারের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের দিকেই যোগসাজশের আঙুল তুলেছেন। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, ২০১১ সালে ২১ জুলাইয়ের শহীদদের (শহীদ দিবস) ন্যায়বিচার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও তৃণমূল কংগ্রেস সরকার দোষী মন্ত্রী, আমলা বা পুলিশ অফিসারদের শাস্তি দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। উল্টে সেই সময়ের স্বরাষ্ট্র সচিব মণীশ গুপ্তকে কোনও রকম তদন্ত বা গ্রেপ্তারের মুখোমুখি না করে মমতা ব্যানার্জি নিজের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দিয়েছেন এবং পরে রাজ্যসভার সাংসদ করেছেন। কাকলি দেবীর দাবি, লালবাজার এবং মহাকরণ (রাইটার্স বিল্ডিংস) থেকে এই মামলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফাইল উধাও করে দেওয়া হয়েছে এবং দোষীদের আড়াল করতে এক গভীর রাজনৈতিক বোঝাপড়া বা আঁতাত কাজ করেছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে এই চিঠির মাধ্যমে ছয়টি নির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। তিনি মামলাটি পুনর্নবীকরণ করে নতুন করে তদন্ত শুরু করা, জ্যোতি বসু আমলের দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ধারায় চার্জশিট গঠন করা, চ্যাটার্জি কমিশনের রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করা এবং প্রয়োজনে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সাহায্য নিয়ে একটি সময়াবদ্ধ ফরেনসিক পুনর্তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন। চিঠির শেষে তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন যে, যদি এবারও ন্যায়বিচার না মেলে, তবে সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণাই দৃঢ় হবে যে তৃণমূল সরকার আসলে দোষীদের আড়াল করতে এবং শহীদদের স্মৃতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে তৎকালীন বাম নেতৃত্বের সঙ্গে গোপনে হাত মিলিয়েছিল। এই চিঠি প্রকাশ্যে আসার পর বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।















