আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিশ্বজুড়ে বিশুদ্ধ জলের সঙ্কট ক্রমশ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানীরা এমন একটি অভিনব প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বদলে দিতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাট অস্টিনের গবেষকরা এমন একটি বিশেষ জ্যাকেট তৈরি করেছেন, যা বাতাস থেকে আর্দ্রতা সংগ্রহ করে পানীয় জলে রূপান্তর করতে সক্ষম।


সাধারণত বাতাস থেকে জল সংগ্রহের জন্য বড় আকারের যন্ত্র, প্যানেল বা স্থির ডিভাইস ব্যবহার করা হয়। এগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় বসিয়ে রাখতে হয় এবং সেখানেই জল উৎপাদন করে। কিন্তু নতুন এই প্রযুক্তির বিশেষত্ব হল, এটি পরিধানযোগ্য। অর্থাৎ, জ্যাকেটটি গায়ে দিয়েই চলাফেরা করা যাবে এবং একই সঙ্গে বাতাস থেকে জল সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।


এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিয়েছেন টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক গুইহুয়া ইউ। তাঁর মতে, এটি ব্যক্তিগত ও বহনযোগ্য জল সংগ্রহ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।


গবেষকদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রযুক্তিটিকে বড় আকারে কার্যকর করা। সাধারণত ছোট আকারের নমুনা ভালোভাবে আর্দ্রতা শোষণ করতে পারলেও আকার বাড়লে কর্মক্ষমতা অনেক কমে যায়। এই সমস্যার সমাধানে বিজ্ঞানীরা বিশেষ ধরনের ফাইবার তৈরি করেছেন, যার অভ্যন্তরে শাখা-প্রশাখার মতো চ্যানেল রয়েছে। ফলে বাতাসের জলীয় বাষ্প দ্রুত শোষিত হয়ে ফাইবারের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।


এই ফাইবারের মূল উপাদান হল উদ্ভিদভিত্তিক হাইড্রোজেল এবং লিথিয়াম ক্লোরাইড নামের একটি লবণ। হাইড্রোজেল জল শোষণ করে ধরে রাখতে পারে, আর লিথিয়াম ক্লোরাইড বাতাস থেকে আর্দ্রতা টেনে আনে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, উন্নত ফাইবারগুলো মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে নিজেদের ওজনের চেয়েও বেশি পরিমাণ জল শোষণ করতে সক্ষম।


জ্যাকেটটিতে চারটি আলাদা জল সংগ্রহ ইউনিট রয়েছে। দুটি বড় এবং দুটি ছোট ইউনিট সামনে ও পেছনে বসানো থাকে। যখন ইউনিটগুলো আর্দ্রতায় পূর্ণ হয়ে যায়, তখন সেগুলো খুলে একটি ভাঁজযোগ্য সংগ্রাহকের মধ্যে রাখা হয়। সেখানে একটি ছোট হিটার ব্যবহারের মাধ্যমে শোষিত জলীয় বাষ্প বের করে আনা হয়। পরে সেই বাষ্প ঠান্ডা হয়ে তরল জলে পরিণত হয় এবং একটি চ্যানেলের মাধ্যমে সংগ্রহ করা যায়।


গবেষকরা শুধু ল্যাবরেটরিতেই নয়, বাস্তব পরিবেশেও এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অস্টিন শহর এবং চীনের দুটি ভিন্ন স্থানে পরীক্ষার সময় জ্যাকেটটি প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৯০০ মিলিলিটার পর্যন্ত বিশুদ্ধ পানীয় জল উৎপাদন করেছে। অর্থাৎ, এক থেকে দুই বোতল জলের সমপরিমাণ জল কেবল বাতাস থেকেই সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।


পরীক্ষায় প্রাপ্ত জল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পানীয় জলের মানদণ্ড পূরণ করেছে। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি ব্যাকপ্যাক, তাঁবু, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র এবং অন্যান্য বহনযোগ্য সরঞ্জামেও ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে মরু অঞ্চল বা জলসংকটপূর্ণ এলাকায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই উদ্ভাবন ভবিষ্যতে কোটি কোটি মানুষের নিরাপদ পানীয় জলের চাহিদা মেটাতে সহায়ক হতে পারে এবং জল সংগ্রহ প্রযুক্তিতে এক নতুন যুগের সূচনা করবে।