আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২৪ ও ২৫ জুন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানায় নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক কার্যকলাপ। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ভেনেজুয়েলা, জাপান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠেছে— এই ঘটনাগুলি কি পরস্পরের সঙ্গে কোনওভাবে যুক্ত?


বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রশ্ন স্বাভাবিক হলেও বাস্তবে এই ভূমিকম্পগুলির মধ্যে কোনও বৈজ্ঞানিক সম্পর্কের প্রমাণ নেই। এগুলি সম্পূর্ণ ভিন্ন ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে এবং ভিন্ন টেকটোনিক প্লেটের কারণে ঘটেছে।


সবচেয়ে বড় আঘাত আসে ভেনেজুয়েলায়। ভারতীয় সময় ২৫ জুন ভোর ৩টা ৩৪ মিনিট নাগাদ রাজধানী কারাকাসের পশ্চিমে ইয়ারাকুই প্রদেশের মোরন এলাকার কাছে প্রথমে ৭.২ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। তার কয়েক মিনিটের মধ্যেই একই অঞ্চলে আরও শক্তিশালী ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এই জোড়া কম্পনকে গত একশো বছরের মধ্যে ভেনেজুয়েলার অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প বলে মনে করা হচ্ছে।


ভূমিকম্পে একাধিক ভবন ধসে পড়ে, ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, অন্তত ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। তবে উদ্ধারকাজ চলতে থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পর জাপানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইওয়াতে প্রিফেকচারের উপকূলবর্তী প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় ৭.২ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। জাপানে প্রবল কম্পন অনুভূত হলেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।


এর আগে ২৪ জুন রাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার মেনডোসিনো কাউন্টির রেডউড ভ্যালির কাছে ৫.৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। কম্পনের ফলে কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং সামান্য আঘাতের ঘটনা ঘটলেও কোনও মৃত্যুর খবর মেলেনি।


ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই তিনটি ঘটনার মধ্যে কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। ভেনেজুয়েলা অবস্থিত ক্যারিবিয়ান ও দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে, যেখানে প্লেট দুটি একে অপরের পাশ দিয়ে সরে যায়। অন্যদিকে, জাপান অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল ‘রিং অব ফায়ার’-এ, যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেট অন্য প্লেটের নিচে ঢুকে যায়। ক্যালিফোর্নিয়ার ভূমিকম্প আবার সান আন্দ্রেয়াস ফল্ট সিস্টেমের সঙ্গে সম্পর্কিত।


বিজ্ঞানীরা বলেন, বড় ভূমিকম্পের ফলে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের ফল্ট লাইনে সামান্য চাপ পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু সেই প্রভাব সাধারণত এতটাই দুর্বল হয় যে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে আরেকটি বড় ভূমিকম্প ঘটানোর মতো ক্ষমতা রাখে না।


প্রতিদিন পৃথিবীতে হাজার হাজার ছোট-বড় ভূমিকম্প ঘটে, যার বেশিরভাগই মানুষ টের পান না। একই দিনে একাধিক ৬ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হওয়া বিরল হলেও অস্বাভাবিক নয়। ভূকম্পবিদদের মতে, ভেনেজুয়েলা, জাপান ও ক্যালিফোর্নিয়ার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলির সময়ের মিল নিছকই কাকতালীয় ঘটনা।


তবে এই ঘটনাগুলি আবারও মনে করিয়ে দিল, পৃথিবী একটি ক্রমাগত পরিবর্তনশীল ও সক্রিয় গ্রহ। ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, গবেষণা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোই ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর অন্যতম প্রধান উপায়।