আজকাল ওয়েবডেস্ক: মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে তেহরান ও অন্যান্য শহরে বিপুল সংখ্যক মানুষের বিক্ষোভের পরেই বৃহস্পতিবার ইরান জুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ইরানের প্রয়াত শাহের পুত্র নির্বাসিত  যুবরাজ রেজা পহলভীর আহ্বানে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। ইরান প্রশাসন প্রধান এলাকাগুলিতে সতর্কতা জারি করেছে। তাবরিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেশ কয়েকটি ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্বকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে স্পষ্ট করে দেন যে, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা শুরু করলে তার দেশ কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু আপনি কি আলি খামেনেইর গল্প জানেন? কীভাবে তিনি একজন সাধারণ ধর্মনেতা থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হলেন? 

১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল মাশহাদে জন্ম। মাত্র ১১ বছর বয়সেই মৌলবি হন। আট ভাইবোনের মধ্যে খামেনেই ছিলেন দ্বিতীয়। যখন তাঁর বয়স আট বছর, তখন তাঁর বাবা-মা তাঁকে মক্তবে পাঠান। সেখানেই তিনি কোরান ও ইসলাম ধর্মের শিক্ষা লাভ করেন। খামেনি তাঁর ‘সেল নাম্বার ১৪: দ্য অটোবায়োগ্রাফি অফ আয়াতুল্লাহ খামেনেই’ বইটিতে লিখেছেন, তিনি অঙ্ক ও ইংরেজিতে ভাল ছিলেন। শিক্ষকদের দেওয়া প্রতিটি প্রশ্নের সমাধান করতে পারতেন।

তিনি তাঁর বইয়ে এও প্রকাশ লিখেছেন যে, কীভাবে তিনি তাঁর বাবার মতো একজন ধর্মীয় নেতা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বই অনুসারে, স্কুলের একটি অনুষ্ঠানে তিনি কোরান থেকে আয়াত আবৃত্তি করেছিলেন। সেই সময়ই তিনি একজন ধর্মীয় নেতা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি কোম শহরে যান এবং ধর্মীয় নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

সেই সময় শাহ মহম্মদ রেজা পহলভী ইরানে শাসন করছিলেন। শাহ ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ রাজা। তিনি দেশে পশ্চিমি ধারণা বাস্তবায়ন করেছিলেন। তাঁর শাসনকালে দেশটিতে মডেলিং, চলচ্চিত্র, নাইটক্লাবের পার্টি এবং পশ্চিমি পোশাক পরার প্রচলন দেখা গিয়েছিল।

বইটিতে খামেনি ১৯৫০-এর দশকে শাহের শাসনামলে প্রচলিত পশ্চিমা সংস্কৃতির কথা উল্লেখ করেছেন। তবে মহরমের মাসে দেশে সিনেমা ও চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ ছিল। তিনি লিখেছেন, “শহরের গভর্নর মহরমের ১ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত সিনেমা বন্ধ রাখার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আদেশ জারি করেন। আমরা এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছিলাম। এই সিদ্ধান্ত আমাদের ভিতরে আগুনের মতো জ্বলে উঠেছিল।” তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, কিন্তু এই ঘটনা তাঁকে তরুণদের মধ্যে পরিচিত ও জনপ্রিয় করে তোলে।

ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের পর খোমেইনি প্যারিস থেকে দেশে ফিরে আসেন এবং একটি নতুন সরকার গঠন করেন। আলি খামেনেইকে বিপ্লবী পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তৎকালীন সাংসদ এবং পরবর্তীতে ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রুহানি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী (সংসদীয়) পদের জন্য খামেনেইর নাম প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, “আমাদের এমন একজন ব্যক্তিকে প্রয়োজন যিনি ইসলামিক বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন এবং সামরিক বিষয়ে খোমেনির দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখবেন। এই দায়িত্বের জন্য সৈয়দ আলি খামেনেই সেরা।”

১৯৮১ সালের ২৭ জুন ইরানের রাজধানী তেহরানে আবুজার মসজিদে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন খামেনেই। অনুষ্ঠান চলাকালীন এক যুবক তাঁর কাছে একটি টেপ রেকর্ডার রেখেছিলেন। কিন্তু সেটি টেপ রেকর্ডার ছিল না। সেটিতে একটি বোমা লুকানো ছিল। বোমাটি বিস্ফোরণের ফলে খামেনেই গুরুতর আহত হন। সেই বোমা হামলার পরেই তাঁর ডান হাত আংশিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এরপর থেকেই জনসমক্ষে তাঁর বাঁ হাত ব্যবহার করা শুরু করেন। বিস্ফোরণে তাঁর ডান হাত ছাড়াও, ফুসফুস এবং কানের স্নায়ুর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তার বুকের একপাশ পুড়ে যায়। বোমার টুকরো তাঁর শরীরের ডান দিকেও আটকে যায়। 

অস্ত্রোপচার শেষে জ্ঞান ফেরার পর খামেনেইয়ের কথা বলার শক্তি ছিল না। বাঁ হাতে লিখে তিনি প্রথম প্রথম প্রশ্ন করেন, ‘আমার মসজিদের সব সঙ্গীরা ঠিক আছেন তো? তাঁকে জানানো হয় যে সকলে সুস্থ আছেন। এরপরেই তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আমার কী হয়েছে?’ ডাক্তাররা তাঁকে বলেন যে তিনি ডান হাতটি আর কখনও ব্যবহার করতে পারবেন না। শান্তভাবে খামেনেই বলেন, “আমার মস্তিষ্ক এবং জিভ কাজ করলেই হবে। হাতের দরকার নেই।”

১৯৮১ সালের ৩০ আগস্ট তেহরানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের একটি বৈঠকে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। এই বৈঠকে প্রেসিডেন্ট মহম্মদ আলি রাজাই এবং প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ জাভাদ বাহোনার উপস্থিত ছিলেন। রাজাই এবং বাহোনার ঘটনাস্থলেই মারা যান। ইরানে এরপরেই একজন নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য দাবি জোরালো হতে শুরু করে। তখন খামেনেই ছিলেন ইসলামিক রিপাবলিকান পার্টির (আইআরপি) অন্যতম প্রধান নেতা। খোমেইনি এবং আইআরপি নেতারা শীর্ষ পদের জন্য তাঁর নাম প্রস্তাব করেন। ১৯৮১ সালের ২ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং খামেনেই ঐতিহাসিক ৯৫ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করেন।