আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মার্কিন ও ইজরায়েলি সামরিক আগ্রাসন গোটা পশ্চিম এশিয়াকে ভয়াবহ অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে—এমনই কড়া সতর্কবার্তা দিলেন লেবাননের প্রতিরোধ সংগঠন হিজবুল্লাহর মহাসচিব শেখ নাঈম কাসেম। সোমবার, ২৬ জানুয়ারি, টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে তিনি জানান, ইরানের বিরুদ্ধে যে কোনও মার্কিন আগ্রাসন হিজবুল্লাহ নিজের বিরুদ্ধেই পরিচালিত আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করবে।

শেখ নাঈম কাসেম বলেন, “আমরা এই হুমকিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। সম্ভাব্য আগ্রাসনের মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সমস্ত প্রস্তুতি এবং ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আমরা সম্পূর্ণ সচেতন ও সক্রিয়।”

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনেইকে হত্যার মার্কিন হুমকির প্রসঙ্গে হিজবুল্লাহ প্রধান স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এই ধরনের পদক্ষেপ শুধু ইরান নয়, গোটা পশ্চিম এশিয়া এমনকি বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ অস্থিরতা ডেকে আনবে।

কাসেমের কথায়, “খামেনেই শুধু ইরানের নেতা নন, তিনি কোটি কোটি মুসলমানের কাছে এক নৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতীক। তাঁকে হত্যা করা হলে মুসলিম বিশ্বের ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে, যার পরিণতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।”

ভাষণে শেখ নাঈম কাসেম আরও জানান, গত কয়েক মাসে বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী ও আন্তর্জাতিক পক্ষ হিজবুল্লাহর কাছে জানতে চেয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল যদি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, সেক্ষেত্রে হিজবুল্লাহ কি হস্তক্ষেপ করবে?

“আমাদের কাছে কার্যত প্রতিশ্রুতি চাওয়া হয়েছিল—যেন আমরা এই যুদ্ধে কোনওভাবেই জড়িত না হই। তারা আগাম আমাদের অবস্থান জানতে চেয়েছিল, যাতে তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারে,” বলেন কাসেম।

তিনি আরও জানান, মধ্যস্থতাকারীরা খোলাখুলি স্বীকার করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল তিনটি বিকল্প নিয়ে ভাবছে—
এক, আগে হিজবুল্লাহ তারপর ইরানকে আঘাত করা;
দুই, আগে ইরান তারপর হিজবুল্লাহ;
তিন, একসঙ্গে উভয়ের ওপর হামলা চালানো।

এই প্রেক্ষাপটে হিজবুল্লাহ মহাসচিব বলেন, “এই সমস্ত সম্ভাবনার মুখে আমরা জানি, আক্রমণ হলে আমাদের বাদ দেওয়া হবে না। তাই আত্মরক্ষার প্রশ্নে আমরা আপসহীন।” তিনি স্পষ্ট করে দেন, পরিস্থিতি ও সংগঠনের স্বার্থ অনুযায়ী হিজবুল্লাহ প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে, তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—“হিজবুল্লাহ কখনও নিরপেক্ষ থাকবে না।”

ইরানের পক্ষে দাঁড়ানো নিয়ে লেবাননের ভিতর থেকেই যে আপত্তি উঠছে, তারও জবাব দেন শেখ নাঈম কাসেম। তাঁর বক্তব্য, “কেউ কেউ বলে শক্তির ভারসাম্য নেই, তাই হিজবুল্লাহর জড়ানো উচিত নয়। কিন্তু আত্মরক্ষা কি কেবল সমান শক্তির প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য?”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, লেবাননের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মার্কিন ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিচ্ছে।

“যারা আমাদের দোষ দেয়—আমরাই নাকি লেবাননকে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছি—তারা কি দেখতে পাচ্ছে না কারা লেবাননকে মার্কিন-ইজরায়েলি প্রকল্পের হাতে তুলে দিচ্ছে?”—প্রশ্ন তোলেন তিনি। শেখ নাঈম কাসেম দাবি করেন, গত চার দশকে হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ আন্দোলনই লেবাননের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও রাজনৈতিক অবস্থান পুনরুদ্ধার করেছে। তাঁর ভাষায়, “তারা লেবানন দখল করতে চায়, কিছুই রেখে যেতে চায় না। প্রতিরোধই লেবাননকে তার সম্মান ফিরিয়ে দেবে।”

ভাষণের শেষে তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হলে এবার তার পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে। গোটা অঞ্চল অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠতে পারে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, গত ৪৩ বছর ধরে ইরান হিজবুল্লাহকে সমর্থন দিয়ে এসেছে—ইজরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লেবাননের বৈধ লড়াইয়ে।
“আত্মসমর্পণ করলে আমরা সব হারাব—সীমান্ত, সম্মান, অস্তিত্ব। কিন্তু আত্মরক্ষার পথ বেছে নিলে সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলবে,”—জোর দিয়ে বলেন হিজবুল্লাহ মহাসচিব।

এই বক্তব্য নতুন করে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আশঙ্কা ঘনীভূত করেছে। কূটনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন একটাই—এই সংঘাত কি নিয়ন্ত্রণে থাকবে, না কি গোটা অঞ্চলকে গ্রাস করবে আরেকটি সর্বাত্মক যুদ্ধ।