আজকাল ওয়েবডেস্ক: ছয় বছরে নয়টি অস্ত্রোপচার, প্রায় ২৩.৯ লক্ষ ইউয়ান ব্যয়, আর শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ শারীরিক বিকৃতি ও মানসিক যন্ত্রণা—চীনের তরুণী লিংলিং-এর অভিজ্ঞতা এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বেইজিংয়ের একটি মেডিক্যাল কসমেটিক ক্লিনিকে স্তন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সৌন্দর্য বৃদ্ধির আশায় যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে রূপ নেয় একটি ভয়াবহ প্রতারণা ও চিকিৎসা অবহেলার কাহিনিতে।
২০১৭ সাল থেকে পরবর্তী ছয় বছরে লিংলিং মোট নয়বার অস্ত্রোপচার করান। এর মধ্যে ছিল স্তনে ইমপ্লান্ট বসানো এবং একাধিকবার সেই ইমপ্লান্ট মেরামত ও সংশোধন। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তাঁকে আশ্বাস দিয়েছিল যে ব্যবহৃত উপাদান সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং তথাকথিত ‘self-derived’, অর্থাৎ তাঁর নিজের শরীরের টিস্যু থেকেই তৈরি। এই আশ্বাসের ভিত্তিতেই তিনি বিপুল অর্থ খরচে রাজি হন।
কিন্তু ২০২৩ সালে এসে তাঁর শরীরে গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। স্তনের ইমপ্লান্টে লিকেজ ও বিকৃতি ধরা পড়ে। অস্বাভাবিক গাঁট তৈরি হয়, যা ক্রমশ বড় হয়ে নিচের দিকে নেমে আসে। লিংলিং পরে বলেন, তাঁর বুকে এমন দুটি গাঁট তৈরি হয়েছিল যা প্রায় পেট পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।
এই অবস্থায় তিনি সংশোধনমূলক অস্ত্রোপচারের জন্য আবার বেইজিংয়ের ওই ক্লিনিকের দ্বারস্থ হন। কিন্তু ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ একটি মেডিক্যাল মূল্যায়ন রিপোর্ট দাবি করে এবং কার্যত দায় এড়িয়ে যায়। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ায় ২০২৪ সালের অক্টোবরে তিনি শাংহাইয়ের একটি হাসপাতালে গিয়ে ইমপ্লান্ট সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করান।
সার্জারির সময় চিকিৎসকেরা লক্ষ্য করেন, ইমপ্লান্টের ভেতরের পদার্থ ইতিমধ্যেই তাঁর শরীরে মারাত্মক ক্ষতি করেছে। পরবর্তী পরীক্ষায় সামনে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তকারীরা নিশ্চিত করেন যে ইমপ্লান্টে মুজ ও গরুর ডিএনএ রয়েছে—যা ক্লিনিকের ‘নিজস্ব টিস্যু’ ব্যবহারের দাবিকে পুরোপুরি মিথ্যা প্রমাণ করে।
জিয়াংসি প্রদেশের এক বিউটি ইন্ডাস্ট্রি ইনসাইডার ফু স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলকে জানান, আগেও এই ক্লিনিকের রোগীরা ইমপ্লান্ট পরীক্ষা করে উট, বাদুড় ও এমনকি গরিলার ডিএনএ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের অমানবিক উপাদান শরীরে প্রবেশ করলে ইমিউন সিস্টেমের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর ক্ষতির কারণ হয়।
একটি স্বীকৃত মেডিক্যাল সংস্থা লিংলিং-এর শারীরিক অবস্থাকে গুরুতর অক্ষমতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই বিকৃতি তাঁকে শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ক্ষতিপূরণ চাইতে গিয়ে লিংলিং আরও এক বাস্তবতার মুখোমুখি হন। দেখা যায়, যে ক্লিনিকে তাঁর অস্ত্রোপচার হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট বিউটি স্যালন—দুটিই ইতিমধ্যেই বন্ধ। পরবর্তী তদন্তে জানা যায়, বেইজিং ক্রিয়েটিং মেডিক্যাল কসমেটিক ক্লিনিকের ব্যবসায়িক লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ৩৯৮টি চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ নথিভুক্ত রয়েছে। ক্লিনিকের প্রধান সার্জন বাই ছিলেন মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষের কাছে অনিবন্ধিত।
চলতি বছরের ১ মার্চ লিংলিং পুরো ঘটনা বেইজিং মিউনিসিপ্যাল হেলথ কমিশনে জানালেও, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। ভুয়ো বিজ্ঞাপনের অভিযোগের বিষয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ দপ্তর জানিয়েছে, তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।
এই ঘটনা মূল ভূখণ্ডের সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্ট আলোচনার ভিউ সংখ্যা ইতিমধ্যেই ৩৭ মিলিয়নের বেশি। কেউ লিখেছেন, রূপ নিয়ে উদ্বেগ আজ বহু মহিলার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে এবং লিংলিং তারই এক দুর্ভাগ্যজনক শিকার। আবার অনেকেই মন্তব্য করেছেন, অসাধু বিউটি ক্লিনিকগুলি বন্ধ হয়ে নতুন নামে আবার খুলে পড়ে, ফলে আইনের আওতায় আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।
অনেকের মতেই, এই ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি দ্রুত বাণিজ্যিক হয়ে ওঠা বিউটি ইন্ডাস্ট্রির অন্ধকার দিক, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সৌন্দর্যের নামে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সামাজিক চাপের এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।
