আজকাল ওয়েবডেস্ক: আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা হাজার হাজার ভারতীয় শিক্ষার্থীর কপালে নতুন করে উদ্বেগের ভাঁজ ফেলতে পারে একটি সংখ্যা—১ লক্ষ মার্কিন ডলার। ট্রাম্প প্রশাসন এমন এক প্রস্তাবের কথা বিবেচনা করছে, যা কার্যকর হলে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করার পর সেখানে কাজ করতে চাওয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের গুণতে হতে পারে এই বিপুল অর্থ। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, হোয়াইট হাউস এখনও এ বিষয়ে কোনও  আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না করলেও অভ্যন্তরীণ স্তরে এই নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। যদি এই প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হয়, তবে বছরের পর বছর ধরে ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের আমেরিকায় নিজেদের কেরিয়ার গড়ে তোলার সবচেয়ে জনপ্রিয় রাস্তাটি কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

বর্তমানে 'অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং' বা ওপিটি (OPT) ব্যবস্থার অধীনে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জনের পর বাড়তি কোনও  কাজের ভিসা ছাড়াই সর্বোচ্চ এক বছর আমেরিকায় কাজ করার সুযোগ পান। আর যারা সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা ম্যাথমেটিক্স—অর্থাৎ স্টেম (STEM) ক্ষেত্রের পড়ুয়া, তারা পান আরও দুই বছরের অতিরিক্ত সময়। অর্থাৎ একজন কম্পিউটার সায়েন্সের গ্র্যাজুয়েট কেবল ওপিটি-র ভরসাতেই টানা তিন বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি করতে পারেন। এটি কেবল শ্রেণিকক্ষ থেকে পেশাগত জগতে প্রবেশের সেতুবন্ধনই করে না, বরং পরবর্তীতে আমেরিকার প্রধান দক্ষ কর্মীদের ভিসা 'এইচ-ওয়ান বি' (H-1B) পাওয়ার অন্যতম বড় ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

নতুন প্রস্তাবে বলা হচ্ছে, এই কাজের অনুমতিটুকু পেতেই গুণতে হবে ১ লক্ষ ডলার—যা ভারতীয় মুদ্রায় সাড়ে ৯৫ লক্ষ টাকারও বেশি। বিপুল অঙ্কের ব্যাংক ঋণ ও পরিবারের সম্বল বাজি রেখে পড়াশোনা শেষ করার পর শিক্ষার্থীদের জন্য এই টাকা জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের দাবি, ওপিটি ব্যবস্থার অপব্যবহার ও ভিসা জালিয়াতি রুখতেই এই চিন্তা। তবে সমালোচকদের স্পষ্ট মত, এতে কেবল প্রকৃত মেধাবীদেরই পথ বন্ধ করা হবে।

এই এক লক্ষ ডলারের অঙ্কটি খুব পরিচিত। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন এইচ-ওয়ান বি (H-1B) ভিসা আবেদনের ওপর একই পরিমাণের ফি চাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মার্কিন প্রযুক্তিক্ষেত্রে এর চরম প্রভাব পড়েছিল, কারণ সে দেশে কর্মরত দক্ষ বিদেশি পেশাদারদের প্রায় তিন- চতুর্থাংশই ভারতীয়। তবে সেই সিদ্ধান্ত আদালতে আইনি ধাক্কা খায় এবং বোস্টনের একটি ফেডারেল আপিল আদালত সম্প্রতি সরকারের ওই পদক্ষেপের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, এইচ-ওয়ান বি-তে বাধা পেয়ে এবার ওপিটি-র ওপর ফি চাপিয়ে বিদেশি কর্মী কমানোর ভিন্ন পথ খুঁজছে মার্কিন প্রশাসন।

এই নিয়ম কার্যকর হলে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসবে ভারতের ওপরই। ওপেন ডোরসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ৩.৬৩ লাখেরও বেশি ভারতীয় শিক্ষার্থী আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করছিলেন—যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মোট আন্তর্জাতিক পড়ুয়াদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ছিলেন ভারতীয়। বিশেষ করে ভারতীয়দের কাছে ওপিটি সুবিধার গুরুত্ব অপরিসীম। তথ্য বলছে, ওপিটি-তে ভারতীয়দের অংশগ্রহণ এক বছরেই ৪৭ শতাংশ বেড়েছে এবং আমেরিকায় পড়াশোনা করা ভারতীয়দের প্রায় ৪০ শতাংশই এই সুবিধা গ্রহণ করেন। অধিকাংশ পরিবারের হিসাবটাই থাকে এমন—মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে পড়াশোনা করো, তারপর ওপিটি-র অধীনে আমেরিকাতেই চাকরি করে সেই ডলারের বেতনে ঋণ শোধ করো। এক লক্ষ ডলারের এই নতুন ফি সেই পুরো আর্থিক সমীকরণটাকেই ভেঙে চুরমার করে দেবে।

আসলে আমেরিকায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতি আগে থেকেই কঠিন হচ্ছিল। ভিসা ইন্টারভিউয়ের দীর্ঘ সময়সূচি ও কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের কারণে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের আগস্টের মধ্যে নতুন ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল। স্বয়ং মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও স্বীকার করেছে, ভিসা সংক্রান্ত অনিশ্চয়তাই বিদেশি শিক্ষার্থী কমার প্রধান কারণ। তার ওপর এইচ-ওয়ান বি ও ওপিটি-র ওপর ক্রমাগত চাপ বৃদ্ধির ফলে ওয়াশিংটন থেকে একটি স্পষ্ট বার্তা মিলছে—দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য আইনি অভিবাসনের পথ দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। শিক্ষা পরামর্শকদের মতে, এর ফলে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা এখন মার্কিন ডিগ্রির মোহ ছেড়ে কানাডা, যুক্তরাজ্য, জার্মানি কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মতো বিকল্প দেশের দিকে অনেক বেশি ঝুঁকতে শুরু করবেন।