আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের ধর্মীয় শাসকরা সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় ধরনের বিরোধিতার মুখে পড়েছেন। এই সুযোগে ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনায় উৎসাহিত হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিচ্ছেন। কিন্তু অতীতে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন পদক্ষেপ খুব একটা সফল হয়নি। এর ফলে একটিই প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে যে, ইরানে মার্কিন হস্তক্ষেপ কেমন হবে। 

প্রেসিডেন্টের যুদ্ধংদেহী মনোভাব সত্ত্বেও, পেন্টাগন ওই অঞ্চলের দিকে কোনও বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেনি। গত বছর ইজরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইরানের বিমান হামলায় বিপর্যস্ত আমেরিকার উপসাগরীয় মিত্ররাও ইরানের ওপর মার্কিন হামলাকে সমর্থন করার ব্যাপারে সামান্যই আগ্রহ দেখিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মত, যে কোনও মার্কিন সামরিক হামলা সম্ভবত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই এবং ইরানি সরকারকে অভ্যন্তরীণ সমর্থন জোগাড় করতে, প্রতিবাদকে অবৈধ প্রমাণ করতে এবং একটি বাহ্যিক হুমকির বিরুদ্ধে আঞ্চলিক জোটকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।

ট্রাম্প ইরানের শাসনের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপের কথা বলেছেন, কিন্তু এই অঞ্চলে কোনও সামরিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। বরং, গত কয়েক মাসে সেনা সংখ্যা কমানো হয়েছে, যা সামরিক বিকল্পগুলিকে আরও সীমিত করে দিয়েছে। গত অক্টোবর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার কোনও বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন নেই। কারণ ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকে গ্রীষ্মকালে ক্যারিবিয়ানে এবং ইউএসএস নিমিৎজকে শরৎকালে আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের একটি বন্দরে পাঠানো হয়েছে। এর অর্থ, ইরানের এবং খামেনেইয়ের ওপর যে কোনও বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে হলে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ও তার মিত্র দেশের বিমানঘাঁটি থেকেই করতে হবে বা সেগুলির সাহায্য নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে, আমেরিকাকে কাতার, বাহরাইন, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ওমান এবং সৌদি আরবের মতো দেশগুলির ঘাঁটি ব্যবহার করার জন্য অনুমতি চাইতে হবে (সম্ভবত সাইপ্রাসে অবস্থিত আমেরিকার আক্রোতিরি ঘাঁটির ক্ষেত্রেও) এবং পাল্টা হামলা থেকে সেই দেশগুলিকে রক্ষাও করতে হবে।

দ্বিতীয় বিকল্পটি হতে পারে জুনে ইরানে ফোরদো-র ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক ঘাঁটিতে দূরপাল্লার বি-২ বোমারু বিমান দিয়ে হামলার মতো ঘটনা। কিন্তু কোনও শহরে বা  জনবহুল স্থানের ওপর এমন হামলা চালানো বিপজ্জনক। আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে তার সম্পদ ব্যবহার না করলেও। আক্রমণ করা হলে দেশটির ঘাঁটি ও জাহাজগুলিতে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন ইরানের নেতারা।

ইজরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেলেও, তেহরান ক্ষেপণাস্ত্রের দিক থেকে এখনও শক্তিশালী। ইরানের প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলি গভীরে পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত। তেহরান সেগুলির পুনর্নির্মাণ করছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানের কাছে প্রায় ২,০০০ ভারী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। যা একসঙ্গে বিপুল সংখ্যায় নিক্ষেপ করা হলে আমেরিকা ও ইজরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম।

আমেরিকাকে যে আরও একটি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তা হল হামলার জন্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা। ইরানের শাসকগোষ্ঠীর ব্যবহৃত সামরিক ও অসামরিক ঘাঁটিগুলি শনাক্ত করা কঠিন হবে না, তবে বিক্ষোভ এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর সরকারের রক্তাক্ত দমনপীড়ন সারা দেশজুড়ে চলছে। এমন সময় লক্ষ্যবস্তু নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা গেলেও সেখানে সাধারণ নাগরিকদের উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই হামলার ফলে প্রাণহানির সম্ভাবনা প্রবল।

এছাড়াও, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, ১৯৫৩ সালের মার্কিন অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে আমেরিকান হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষিতে, ইরান সরকার যে কোনও মার্কিন হামলাকে সহজেই হাতিয়ার করতে পারে। খামেনেই সরকার হয়তো বর্তমানে সাধারণ মানুষের কাছে ততটা জনপ্রিয় মনে নাও হতে পারে। কিন্তু সরকারটিকে দুর্বল বলে মনে হচ্ছে না, কারণ এটি জুনে ইজরায়েলের ধারাবাহিক হামলা মোকাবিলা করে টিকে আছে।

আমেরিকা খামেনেইয়ের ওপর সরাসরি হামলার কথাও বিবেচনা করতে পারে, কিন্তু অন্য দেশের নেতাকে হত্যা করলে বহু আইনি জটিলতার সৃষ্টি হবে। এছাড়াও, শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হবে এমন সম্ভাবনা কম। কারণ খামেনেই তাঁর স্থলাভিষিক্ত করার জন্য তিনজন বরিষ্ঠ ধর্মীয় নেতার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকায় তৈরি করে রেখেছেন।