আজকাল ওয়েবডেস্ক: চীন তার এক দশকের পুরনো সংযোগ-স্থাপনের স্বপ্নকে ফের সামনে নিয়ে এসেছে। তবে এবার তারা ভারতকে এর বাইরেই রেখেছে। 'চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর' (সিএমবিসি) বেজিংয়ের জন্য বঙ্গোপসাগরে পৌঁছানোর একটি নতুন পথের হদিশ। কিন্তু এই পথটি বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে গিয়েছে।
গত মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের বেজিং সফরের সময় চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের বিষয়টি উঠে আসে। চীনের বিদেশ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, 'বৃহত্তর আঞ্চলিক সংযোগের' লক্ষ্যে এই করিডোর এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে 'গ্রেট হল অফ দ্য পিপল'-এ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উভয় পক্ষ আলোচনা করেছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বৃহস্পতিবার বলেন, "আমরা প্রায় ১৫ বছর আগে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব দিয়েছিলাম, কিছুটা অগ্রগতিও হয়েছিল। কিন্তু নানা কারণে চীন যে ফলাফল আশা করেছিল, তা অর্জিত হয়নি।"
ভারত এই করিডোরে যোগ দিতে পারবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইয়াও ওয়েন বলেন, অন্য দেশগুলো যদি যোগ দিতে আগ্রহী হয়, তবে তাদের জন্যও এটি উন্মুক্ত।
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত জানান, এই করিডোর পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হল সংযোগ স্থাপন এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা।
প্রস্তাবিত এই করিডোরটি চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয় পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। সেখান থেকে এটি দু'টি শাখায় বিভক্ত হবে। একটি শাখা ইয়াঙ্গুনের দিকে এবং অন্যটি রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরের দিকে যাবে। চীন রাখাইন হয়ে এটিকে বাংলাদেশের দিকে আরও সম্প্রসারিত করতে চায়, যাতে এটি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এর ফলে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সঙ্গে বেজিংয়ের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ গড়ে উঠবে।
বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার করিডোর বিষয়ক পুরোনো পরিকল্পনা
'চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর' (সিএমবিসি) হল একটি পুরোনো ও আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনারই নতুন রূপ। নব্বইয়ের দশকে, মান্দালয় ও ঢাকার মধ্য দিয়ে কুনমিং থেকে কলকাতাকে সংযুক্ত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার করিডোরের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ'-এর বিষয়ে ভারতের ক্রমবর্ধমান সংশয় এবং চীন-ভারত সম্পর্কের সামগ্রিক অবনতির কারণে বিসিআইএম প্রকল্পটি আর টিকে থাকতে পারেনি। ২০১৯ সালের মধ্যেই বিআরআই-এর আওতাভুক্ত করিডোরগুলোর আনুষ্ঠানিক তালিকা থেকে বিসিআইএম-কে নীরবে বাদ দেওয়া হয়।
জটিলতা বা সমস্যা কী?
এই করিডোরের মূল পথটি কুনমিং থেকে মিয়ানমারের উপকূল পর্যন্ত প্রায় ১,৭০০ কিলোমিটার বিস্তৃত। এটি সরাসরি রাখাইন রাজ্যের মধ্য দিয়ে গিয়েছে, যা মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধে অন্যতম সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল।
রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২০২৬ সালের একটি ব্রিফিং অনুযায়ী, মিয়ানমারের জুন্টা সরকার এখন দেশটির ভূখণ্ডের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রতিরোধ বাহিনী ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দখলে রয়েছে আনুমানিক ৪২ শতাংশ এলাকা। বাকি অংশটি বিতর্কিত অথবা সেখানে সক্রিয় সংঘাত চলছে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মান্দালয়-কিয়াউকফিউ রেলপথ প্রকল্পের বিষয়ে ২০২১ সালে মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও, পরবর্তী বছরগুলোতে এর নির্মাণকাজের কোনও সময়সূচিই নির্ধারিত হয়নি।
বাংলাদেশ এতে স্বাক্ষর করেনি
বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমান ২৭ জুন সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে প্রস্তাবটি "পর্যালোচনা করছে" এবং এ বিষয়ে এখনও কোনও "সুনির্দিষ্ট অবস্থান নেয়নি"। এছাড়া, মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে স্থলপথে কোনও সংযোগ স্থাপনের বিষয়টি রাখাইন রাজ্যে শান্তি পুনরুদ্ধারের শর্তের ওপর নির্ভরশীল বলে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন।
ভারতের ওপর চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের প্রভাব
ভারতের পূর্বাঞ্চলে এই করিডোর তৈরির পরিকল্পনাটি এমন সময়ে নেওয়া হয়েছে যখন চীন পশ্চিম দিকে 'চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর' -এর মাধ্যমে আরব সাগরে প্রবেশের সুবিধা পেয়েছে। ভারত 'চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর'-এর তীব্র বিরোধিতা করে আসছে, কারণ এটি গিলগিট-বাল্টিস্তানের মধ্য দিয়ে গিয়েছে - যা পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের অংশ।
এর মাধ্যমে চীন ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে ভারত মহাসাগরে প্রবেশের পথ তৈরি করছে। ঠিক যেমনটি 'চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর' এবং গোয়াদার বন্দরের মাধ্যমে পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তে করা হয়েছে। 'চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর'-এর সম্প্রসারণ এবং গোয়াদারকে একটি আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত করার বিষয়ে শি জিনপিং ও পাকিস্তানের শাহবাজ শরিফের মধ্যে ‘নতুন ও ব্যাপক ঐকমত্য’ প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই 'চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর' নিয়ে এই তৎপরতা শুরু হল। একে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগর - উভয় উপকূলীয় অঞ্চলে একই সঙ্গে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে চীনের নেওয়া বৃহত্তর কৌশলেরই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যার মাধ্যমে তারা উভয় উপকূলজুড়ে নয়াদিল্লির প্রথাগত প্রভাববলয়কে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে।
তারেক রহমান ও শি জিনপিংয়ের মধ্যকার বৈঠকে বেশ কিছু সম্পূরক চুক্তি ও সমঝোতাও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ব্যবস্থা এবং সবুজ অর্থনীতি ও ডিজিটাল খাতে সহযোগিতা। পাশাপাশি এতে ‘এক-চীন নীতি’র প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় সমর্থনের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
















