বিয়ের সানাই বাজতে আর মাত্র এক মাস বাকি ছিল। জয়পুরের রাজকীয় প্রাসাদ বুকিং থেকে শুরু করে মধুচন্দ্রিমার জন্য বালির টিকিট— সমস্ত প্রস্তুতি ছিল তুঙ্গে। কিন্তু সেই আনন্দঘন মুহূর্ত নিমেষের মধ্যে বদলে গেল এক ভয়ঙ্কর শ্মশানের নিস্তব্ধতায়। পুনের ঐতিহাসিক লোহাগড় কেল্লার ৪০০ ফুট গভীর খাড়াই উপত্যকা থেকে নীচে পড়ে মৃত্যু হল ২৪ বছরের তরুণ ব্যবসায়ী কেতন বিশাল অগরওয়ালের। প্রথমে এই মৃত্যু একটি নিছক পাহাড়ি ট্রেকিং দুর্ঘটনা বলে মনে করা হলেও, পুলিশের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তে সামনে এলো এক হাড়হিম করা সত্য। পুলিশ স্পষ্ট জানিয়েছে, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং হবু বউ এবং তাঁর গোপন প্রেমিকের নিখুঁত নীল নকশায় সাজানো এক ঠান্ডা মাথার খুন!


পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, কেতনের হবু স্ত্রী সিয়া গোয়েলের জন্মদিন উদযাপন এবং প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের অছিলায় বন্ধুদের একটি দলের সঙ্গে পুনের লোহাগড় কেল্লায় বেড়াতে গিয়েছিলেন কেতন। কিন্তু কেতন জানতেন না যে, ওঁর জন্য সেখানে খুনের ফাঁদ পাতা রয়েছে।

সিয়া গোয়েলের সঙ্গে তলে তলে চেতন চৌধুরী নামের এক যুবকের গভীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরিবার কেতনের সঙ্গে সিয়ার বিয়ে ঠিক করলেও, সিয়া ও চেতন কোনওভাবেই এই বিয়ে চাননি। আর সেই কারণেই কেতনকে চিরতরে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করতে শুরু করেন তাঁরা! তদন্তকারীদের দাবি, কেতনকে মারার চেষ্টা এই প্রথম নয়, এর আগেও গত ১৪ই জুন তাঁরা কেতনকে এই লোহাগড় কেল্লাতেই নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে একটি নির্জন জায়গায় হঠাৎ ‘সাপের আক্রমণ’-এর ভয় দেখিয়ে কেতনকে পাহাড় থেকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সেবার কেতন কোনওক্রমে বেঁচে যান এবং হবু স্ত্রীর এই ভয়ঙ্কর রূপ বা ষড়যন্ত্রের একবিন্দুও আঁচ করতে পারেননি।

প্রথমবার ব্যর্থ হলেও হাল ছাড়েনি সিয়া ও চেতন। গত ১৯শে জুন সিয়া অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে লোহাগড়ে আরও একটি ট্রেকিং অভিযানের পরিকল্পনা করেন। সবাই মিলে যখন উঁচু পাহাড়ের ওপর কেল্লার একটি নির্জন প্রান্তে পৌঁছান, তখনই আসে সেই মোক্ষম সুযোগ। চারপাশ ফাঁকা দেখে পিছন থেকে কেতন অগরওয়ালকে সজোরে ধাক্কা মারেন সিয়া ও চেতন। চোখের পলকে পাহাড়ের প্রায় ৪০০ ফুট খাড়াই উপত্যকা থেকে নীচে পড়ে যান কেতন। তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ওঁর।


কেতনের পরিবারের এক সদস্যের বয়ানে এই ঘটনার পেছনের আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। বিয়ের আগে কেতন ও সিয়ার ‘বালি’  ভ্রমণে যাওয়ার কথা ছিল। বেড়ানোর সমস্ত বুকিং সম্পন্ন করে তাঁরা বাড়ি থেকে রওনাও হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু মাঝরাস্তায় হঠাৎ সিয়া নাটক শুরু করেন যে ওঁর পাসপোর্ট হারিয়ে গেছে! বাধ্য হয়ে সেই ট্রিপ বাতিল করতে হয়।

এরপর কেতন সিয়ার মন ভাল করতে এবং ওঁর জন্মদিন পালন করতে মহাবালেশ্বরের একটি অত্যন্ত বিলাসবহুল রিসর্ট বুক করেন। এমনকী  বিয়ের জন্য জয়পুরের একটি রাজকীয় প্রাসাদও ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। যে ছেলে হবু স্ত্রীর প্রতি এত যত্নশীল ছিল, ওঁর এই নৃশংস পরিণতি কোনওভাবেই মেনে নিতে পারছে না কেতনের পরিবার।

ঘটনার পর পুলিশ যখন সিয়া গোয়েলকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে, তখন থেকেই ওঁর বয়ানে অসঙ্গতি ধরা পড়ে। সিয়া অনবরত তথ্য গোপন করার চেষ্টা করছেন বুঝতে পেরে তদন্তকারীরা ওঁর মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। আর তাতেই চেতন চৌধুরীর সঙ্গে ওঁর চ্যাটিং ও খুনের ষড়যন্ত্রের সমস্ত খুঁটিনাটি বেরিয়ে পড়ে।

আপাতত হত্যাকাণ্ডের আরও কিছু অকাট্য প্রমাণ সংগ্রহ করে বিষয়টি আদালতে প্রমাণ করার জন্য কোমর বেঁধে নেমেছে পুনে পুলিশ।