আজকাল ওয়েবডেস্ক: দিল্লিতে বিক্ষোভ চলাকালীন লাঠিধারী সাদা পোশাকের পুলিশের উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে—প্রশ্ন উঠেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ কর্মীরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক কি না। যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের দৃশ্যগুলোতে দেখা গিয়েছে, সাধারণ পোশাকে থাকা বেশ কয়েকজন ব্যক্তি ভিড় নিয়ন্ত্রণ করছেন, যা আইনি বৈধতা, জবাবদিহি এবং নাগরিকদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
পুলিশ কর্মীরা কি সাদা পোশাকে কাজ করতে পারেন?
হ্যাঁ। ভারতে এমন কোনও আইনি বাধ্যবাধকতা নেই যার ফলে সব পুলিশ সদস্যকে সবসময় ইউনিফর্ম পরতে হবে। ভারতের সব থানাতেই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, গোপন অভিযান, অপরাধ-বিরোধী কার্যক্রম, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং ভিআইপি সুরক্ষার মতো কাজের জন্য সাধারণ পোশাকে থাকা কর্মকর্তাদের ব্যবহার করা হয়।
সাদা পোশাকে পুলিশি কার্যক্রম দীর্ঘকাল ধরেই একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। বিশেষ করে সেসব ক্ষেত্রে যেখানে কর্মকর্তার পরিচয় প্রকাশ পেলে কোনও অভিযান ব্যাহত হতে পারে।
সাদা পোশাকের পুলিশ কি কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করতে পারে?
হ্যাঁ, তবে কিছু প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ সাপেক্ষে।
সাধারণ পোশাক পরার কারণেই একজন পুলিশ কর্মী তাঁর আইনি ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হন না। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত শর্তাবলি মেনে সাদা পোশাকের কর্মকর্তা সন্দেহভাজনকে আটক বা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারেন, প্রয়োজনে যুক্তিসঙ্গত বলপ্রয়োগ করতে পারেন এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণেও করতে পারেন।
তা সত্ত্বেও, এই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে ইউনিফর্মধারী পুলিশ সদস্যদের মতোই আইনি বিধিনিষেধ ও নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়।
সাদা পোশাকের পুলিশদের কি নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে হয়?
অনেক ক্ষেত্রেই, হ্যাঁ।
যদিও এমন কোনও আইনি বাধ্যবাধকতা নেই যে সাদা পোশাকের প্রত্যেক পুলিশকর্মীকে সবসময় পরিচয়পত্র বা ব্যাজ প্রদর্শন করতে হবে, তবুও ভারতীয় আইন এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকায় জোর দেওয়া হয়েছে যে, গ্রেপ্তার বা বলপ্রয়োগমূলক ক্ষমতা প্রয়োগকারী পুলিশদের স্পষ্টভাবে নিজেদের পরিচয় জানানো উচিত।
‘ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস), ২০২৩’ অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকারী প্রত্যেক পুলিশ কর্মকর্তার নামসহ সঠিক, দৃশ্যমান ও স্পষ্ট পরিচয় বহন করা প্রত্যাশিত, যাতে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি সহজেই তাঁদের শনাক্ত করতে পারেন। এটি ‘কোড অফ ক্রিমিনাল প্রসিডিউর’ সিআরপিসি)-এর অধীনে আগে বিদ্যমান সুরক্ষাব্যবস্থাকেই বজায় রেখেছে।
সুপ্রিম কোর্ট কী বলে?
‘ডি কে বসু বনাম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য’ (১৯৯৭) মামলার ঐতিহাসিক রায়ে হেফাজতে থাকাকালীন নির্যাতন বা অপব্যবহার রোধে গ্রেপ্তারের বিষয়ে বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে: গ্রেপ্তারকারী পুলিশ সদস্যদের অবশ্যই স্পষ্ট পরিচয়পত্র ও নেম-ট্যাগ বহন করতে হবে, গ্রেপ্তারকারী কর্মকর্তাদের বিস্তারিত তথ্য নথিবদ্ধ করতে হবে, গ্রেপ্তারের আনুষ্ঠানিক নথিপত্র (অ্যারেস্ট মেমো) তৈরি করতে হবে, পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের বিষয়টি জানাতে হবে এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করতে হবে।
ভারতে গ্রেপ্তার সংক্রান্ত কার্যপ্রণালীর মূল ভিত্তি হিসেবে এই নির্দেশিকাগুলো এখনও কার্যকর রয়েছে।
পুলিশ পরিচয় দিয়ে কেউ আপনাকে থামালে আপনার অধিকার কী?
সাধারণ পোশাকে থাকা কেউ যদি নিজেকে পুলিশ কর্মকর্তা বলে দাবি করেন, তবে আপনি যৌক্তিকভাবেই তাঁর নাম ও পদবি; তিনি কোন থানা বা ইউনিটের সদস্য; তাঁর সরকারি পরিচয়পত্র (পরিস্থিতি অনুকূল হলে); এবং আপনাকে কেন আটক বা জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে—সেসব বিষয়ে জানতে চাইতে পারেন।
আপনাকে যদি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়, তবে সংবিধান ও ফৌজদারি কার্যবিধি আইন অনুযায়ী আপনার আরও কিছু অধিকার রয়েছে। যেমন—গ্রেপ্তারের কারণ সম্পর্কে অবহিত হওয়া এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আপনাকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা।
বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন নিয়ে কেন বিতর্ক রয়েছে?
দিল্লিতে বিক্ষোভ চলাকালে সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যদের লাঠি হাতে ভিড় নিয়ন্ত্রণে সরাসরি অংশ নিতে দেখা যাওয়ার পর এই নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
সমালোচকদের মতে, পুলিশকর্তারা সহজে শনাক্ত করা না গেলে তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা সাধারণ মানুষের ভিড় থেকে পুলিশকে সহজে আলাদা করতে পারেন না। এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগের তদন্ত করাও জটিল হয়ে যায়।
তবে পুলিশের যুক্তি হল, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে (বিশেষ করে বড় ধরনের বিক্ষোভের সময়) সাধারণ পোশাকে কর্মকর্তা মোতায়েন করা একটি প্রচলিত ও স্বীকৃত কর্মপদ্ধতি।
কর্মকৌশলগত গোপনীয়তা রক্ষার প্রয়োজনে কর্মকর্তারা সাধারণ পোশাক পরতেই পারেন, কিন্তু যখনই তাঁরা পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, তখন আইন অনুযায়ী তাঁদের শনাক্তযোগ্য হওয়া বাঞ্ছনীয় - তা দৃশ্যমান পরিচয়পত্রের মাধ্যমে হোক কিংবা প্রয়োজনে নিজেদের পরিচয় প্রকাশের মাধ্যমেই হোক। আদালত বারবারই জোর দিয়ে বলেছে যে, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি অপরিহার্য সুরক্ষা-ব্যবস্থা।
















