আজকাল ওয়েবডেস্ক: পাথর কি সত্যি জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে? বিজ্ঞান এক বাক্যে তা নাকচ করলেও, অন্ধ্রপ্রদেশের কাটিপুরম (কানিপাকম) গ্রামের ছবিটা একেবারেই আলাদা। সেখানে যুগের পর যুগ ধরে এক অলৌকিক কাহিনীর সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে শ্রী বরসিদ্ধি বিনায়ক মন্দির। রূপকথা নয় কিংবা কোনো দৃষ্টিভ্রমও নয়, প্রতি বছর একটু একটু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে এখানকার স্বয়ংভূ গণেশ মূর্তির আয়তন। এই কায়াবৃদ্ধির কারণ খুঁজতে নেমেছিলেন গবেষকেরাও, কিন্তু আবহাওয়া বা রাসায়নিক বিক্রিয়ার কোনো তত্ত্ব দিয়েই এ রহস্যের জট মেলেনি।
এই অলৌকিকতার সূচনা বহু শতক আগে। লোকগাথা অনুযায়ী, গ্রামে বাস করতেন মূক, বধির ও অন্ধ তিন ভাই। জমি সেচের পানির খোঁজে তাঁরা একদিন একটি কুয়ো খুঁড়তে শুরু করেন। হঠাৎই তাঁদের মাটি কাড়ার যন্ত্র একটি শক্ত বস্তুতে আঘাত করে এবং মুহূর্তের মধ্যে কুয়ো থেকে রক্তলাল পানি উপচে উঠতে থাকে। সেই দৈব স্পর্শে অলৌকিকভাবে মুহূর্তের মধ্যে তিন ভাইয়ের সমস্ত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সেরে যায়। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামবাসীরা সেখানে ছুটে আসেন এবং কুয়োর জলে ভেসে উঠতে দেখেন বিঘ্নহর্তা গণপতির এক পবিত্র বিগ্রহ। কুয়োর গভীর থেকে উঠে আসা এই স্বয়ম্ভূ মূর্তির শেষ কোথায়, তা আজও জানা সম্ভব হয়নি; কুয়োটি আজও পানিতে পূর্ণ থাকে এবং সেই প্রবহমান জলধারার মাঝেই অধিষ্ঠান করছেন দেবতা।
মূর্তির এই রহস্যময় বৃদ্ধি নিয়ে স্থানীয়দের বিশ্বাস ও বিস্ময় গাঢ় হয় কয়েক দশক আগের একটি ঘটনায়। দেবতাকে পরানোর জন্য মূর্তির সঠিক মাপে একটি সুদৃশ্য রুপোর বর্ম তৈরি করা হয়েছিল, যা সেই সময়ে গণেশের শরীরে চমৎকারভাবে খাপ খেয়ে যেত। কিন্তু আজ সেই পোশাক আর দেবঅঙ্গে আঁটছে না! বিগ্রহ চারদিক থেকে চওড়া ও দীর্ঘ হয়ে ওঠায় পুরনো বর্মটি এখন অনেকটাই ছোট হয়ে পড়েছে। ফলে এখন অগত্যা দেবতার অলঙ্করণের জন্য নতুন ও বৃহৎ আকারের অলঙ্কার তৈরি করতে হচ্ছে।
ইতিহাসের পাতায় নজর রাখলে দেখা যায়, এই অলৌকিক বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই একাদশ শতাব্দীতে চোল রাজবংশের রাজা প্রথম কুলোতুঙ্গ চোল এখানে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ১৩৩৬ খ্রিস্টাব্দে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের শাসকেরা এই মন্দিরের সৌন্দর্য ও রূপ আরও প্রসারিত করেন। বর্তমানে অন্ধ্রপ্রদেশের এন্ডোমেন্টস বিভাগ এবং তাদের দ্বারা গঠিত ১৫ সদস্যের একটি ট্রাস্ট বোর্ড এই মন্দিরের তদারকি ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। প্রতি বছর গণেশ চতুর্থী (বিনায়ক চবিথি) উপলক্ষে এখানে টানা ২১ দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী 'বার্ষিক ব্রহ্মোৎসব' পালিত হয়, যেখানে বিভিন্ন বাহনে চড়ে গণপতি বাপ্পার শোভাযাত্রা দেখতে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ ভক্তের সমাগম ঘটে। কুয়োর জলের মাঝে বিরাজমান এই প্রসারমান বিগ্রহ মানুষের বিশ্বাস ও অচেনা জগতের পরম বিস্ময় হয়ে আজও বিরাজ করছে।
















