আজকাল ওয়েবডেস্ক: এযেন মহাকাশ থেকে দেখা এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক দৃশ্য। উত্তর ভারত থেকে হিমালয়, চিন হয়ে দক্ষিণ কোরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৭,০০০ থেকে ১০,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশাল বৃষ্টির মেঘের ব্যান্ড ধরা পড়েছে সর্বশেষ উপগ্রহ চিত্রে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এটি ২০২৬ সালের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমীর অন্যতম শক্তিশালী এবং সক্রিয় পর্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই বিশাল মেঘমালা মূলত একটি মনসুন কনভারজেন্স জোন। ভারত মহাসাগর থেকে আসা আর্দ্র মৌসুমী বায়ু যখন উত্তর ভারতের উপর দিয়ে হিমালয় এবং পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন আবহাওয়া ব্যবস্থার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন তৈরি হয় এই দীর্ঘ মেঘের করিডর। এর ফলেই ভারত, চিন, কোরিয়া এবং পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে একযোগে প্রবল বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে।
গত দু'দিনে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে স্বাভাবিকের তুলনায় ১৭০ থেকে ১৮০ শতাংশ বেশি দৈনিক মৌসুমী বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। চলতি মরশুমে এটিই এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের সময় বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। তাঁরা এই পরিস্থিতিকে একটি "ম্যাসিভ মনসুন ডে" হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
উপগ্রহ চিত্রে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ঘন মেঘের আস্তরণ মধ্য, উত্তর ও পূর্ব ভারতের বিশাল অংশ ঢেকে রেখেছে। সেখান থেকে মেঘের বিস্তার উত্তর-পূর্বে হিমালয় অতিক্রম করে চিন এবং আরও পূর্ব দিকে জাপান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, মৌসুমী অক্ষরেখা বা মনসুন ট্রফ সক্রিয় থাকলে এবং বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতার প্রবল সঞ্চালন ঘটলে এই ধরনের দীর্ঘ মেঘের ব্যান্ড তৈরি হয়। উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু উপরে উঠে ঠান্ডা হয়ে বিশাল বজ্রগর্ভ মেঘে পরিণত হয়, যার ফলেই বিস্তীর্ণ এলাকায় একটানা বৃষ্টি ও বজ্রঝড় দেখা দেয়।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বৃষ্টির ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে এই নতুন বৃষ্টির দফা সেই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে উত্তর ও মধ্য ভারতের মৌসুমী বৃষ্টির পরিসংখ্যান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।
ইতিমধ্যেই উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লি-এনসিআর এবং রাজস্থানের বিভিন্ন অংশে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগরে তৈরি নিম্নচাপের প্রভাবে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন এলাকাতেও প্রবল বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে।
তবে এই সক্রিয় মৌসুমী পরিস্থিতির সঙ্গে বাড়ছে উদ্বেগও। আগামী কয়েকদিন ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর। ফলে উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ-সহ পার্বত্য এলাকায় হড়পা বান, ভূমিধস, নদীর জলস্তর বৃদ্ধি এবং জলাবদ্ধতার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসন ইতিমধ্যেই সতর্কতা জারি করেছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশাল মেঘের ব্যান্ড আরও একবার প্রমাণ করল যে ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু কেবল একটি আঞ্চলিক আবহাওয়া ব্যবস্থা নয়, বরং এটি গোটা এশিয়ার আবহাওয়ার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আরব সাগর থেকে শুরু করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহ লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন, কৃষি ও জলসম্পদের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস, সপ্তাহজুড়েই মৌসুমী বায়ু সক্রিয় থাকবে। এর ফলে দেশের মৌসুমী বৃষ্টির ঘাটতি আরও কমবে, জলাধারগুলিতে জল বাড়বে এবং চলতি খরিফ চাষের জন্যও অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হবে।
















