আজকাল ওয়েবডেস্ক: কোরবানির ঈদ বা বকরি ঈদের আগে আবাসন চত্বরে অস্থায়ী শেড তৈরি এবং কোরবানির ছাগল বেঁধে রাখাকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ছড়াল মহারাষ্ট্রের থানে জেলার মিরা রোড এলাকায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে বিশাল পুলিশ বাহিনী। ঘটনার জেরে তৈরি হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মিরা রোডের একটি আবাসনে কোরবানির ছাগল নিয়ে আসা এবং একটি অস্থায়ী শেড তৈরি করা নিয়ে প্রথম বিবাদের সূত্রপাত হয়। আবাসনবাসীদের একাংশের পাশাপাশি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) এবং বজরং দলের সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হয়ে এই ঘটনার তীব্র বিরোধিতা শুরু করেন। পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে ২৫শে মে গভীর রাতে। অভিযোগ, ২৬শে মে রাত ১২টা ৫০ মিনিট নাগাদ এক ব্যক্তি ওই বিক্ষোভকারীদের ভিড়ের মধ্যে এসে স্থানীয় ভিএইচপি নেতা নাগনাথ কাম্বলের খোঁজ করতে থাকেন। বিক্ষোভকারীরা তার পরিচয় জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি আচমকাই একটি ধারালো ছুরি বের করে হামলা চালানোর চেষ্টা করেন। সেই সময় দুপক্ষের ধস্তাধস্তিতে ব্লেডের আঘাতে অন্তত তিনজন ভিএইচপি কর্মী জখম হন। এই ঘটনায় হর্ষ সিং নামের এক আহত কর্মীর অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে এবং অভিযুক্তকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
এই হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই পরিস্থিতি আরও অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং বজরং দলের কর্মী-সমর্থকরা বিপুল সংখ্যায় ওই আবাসনের গেটের সামনে জড়ো হয়ে হনুমান চালিসা পাঠ করে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। তারা অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থার দাবি জানান। এরই মধ্যে একদল বিক্ষোভকারী ওই আবাসন চত্বরে 'শূকর পূজা' করার যুক্তি দেখিয়ে একটি শূকর নিয়ে আসার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের মাঝপথেই আটকে দেয়। উল্লেখ্য, আগামী ১২ই সেপ্টেম্বর বরাহ জয়ন্তী উপলক্ষে এই পূজা হওয়ার কথা থাকলেও, ছাগল আনার পালটা প্রতিবাদ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে। ঘটনার গুরুত্ব বুঝে ডভিশনাল কমিশনার অফ পুলিশ সহ পদস্থ পুলিশ কর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুপক্ষের সাথে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
এদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বোরিভলির বিজেপি বিধায়ক সঞ্জয় উপাধ্যায় এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, বোরিভলির একটি আবাসনেও একটি মুসলিম পরিবার নিয়ম বহির্ভূতভাবে ছয়টি ছাগল নিয়ে এসেছে, যার বিরুদ্ধে পুরো সোসাইটি সরব হয়েছে। মিরা রোডের ঘটনাও একই রকম। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যদি সংবিধান না মেনে শরিয়ত অনুযায়ী চলতে চায়, তবে ছাগলের জবাব শূকর দিয়েই দেওয়া হবে।
পালটা সুর শোনা গেছে স্থানীয় শিবসেনা মন্ত্রী তথা বিধায়ক প্রতাপ সারনায়েক-এর গলায়। তিনি সবাইকে সংযম বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন যে, আবাসনগুলিতে সব সম্প্রদায়ের মানুষেরই একে অপরের ভাবাবেগকে শ্রদ্ধা করা উচিত। একই সাথে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু বহিরাগত মানুষ এসে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে সমাজবাদী পার্টির নেতা আবু আজমি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, কোনও অবস্থাতেই বেআইনি কোরবানি সমর্থনযোগ্য নয়। তবে যেখানে নিয়ম মেনে অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সেখানে যাতে নির্দিষ্ট ঘেরাটোপের মধ্যে গাইডলাইন মেনে কোরবানির কাজ সম্পন্ন হয়, প্রশাসনকে তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, যেহেতু মুসলিমরা এখানে সংখ্যালঘু, তাই প্রশাসনের উচিত তাদের সহযোগিতা করা। যারা নিয়মের বাইরে গিয়ে উস্কানিমূলক মন্তব্য করছেন, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
এই ঘটনার রেশ পৌঁছেছে প্রতিবেশী মুম্বাইতেও। মুম্বাইয়ের মেয়র ঋতু তাওড়ে সহ একাধিক বিজেপি নেতা ইতিমধ্যেই বৃহন্মুম্বাই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (বিএমসি)-এর কাছে দাবি জানিয়েছেন যাতে বকরি ঈদে আবাসন বা চালগুলিতে ছাগল কোরবানির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে একটি সার্কুলার পাঠানো হয়। তাদের দাবি, পশুবলির নির্দিষ্ট নিয়ম থাকা সত্ত্বেও বহু আবাসিক এলাকায় নিয়ম ভেঙে ছাগল নিয়ে আসা হচ্ছে। যদিও বিএমসি আধিকারিকদের দাবি, এই বিষয়ে ইতিমধ্যেই কঠোর নির্দেশিকা বলবৎ রয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর নজর রেখে এবং বকরি ঈদের আগে গবাদি পশু পাচার ও বেআইনি কসাইখানা রুখতে মহারাষ্ট্র সরকার ইতিমধ্যেই পুলিশকে কড়া পদক্ষেপ করার নির্দেশ দিয়েছে। প্রয়োজনে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ‘মকোকা’ (MCOCA) আইন প্রয়োগ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে।















