আজকাল ওয়েবডেস্ক: ব্রাহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র তার চূড়ান্ত আক্রমণ পর্যায়ে অত্যন্ত নিচু উচ্চতায় থেকেও উচ্চগতির জটিল ম্যানুভার করে। এটি শত্রুপক্ষের রাডার ট্র্যাকিং ও ফায়ার-কন্ট্রোল সিস্টেমকে বিভ্রান্ত করে দেয়। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এবং লক্ষ্যবস্তুতে সুনির্দিষ্ট আঘাত হানার ক্ষেত্রে এই ম্যানুভারিং ক্ষমতা ব্রহ্মোসকে অন্য যেকোনও প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় আলাদা করে তোলে।


নিচু উচ্চতায় সমুদ্রপৃষ্ঠ ঘেঁষে উড়ে রাডার এড়ানো
ব্রাহ্মোসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল চূড়ান্ত পর্যায়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০–১৫ মিটার উচ্চতায় উড়ে যাওয়ার ক্ষমতা। এত নিচে উড়লে শত্রু রাডারে প্রতিফলিত সংকেত আশপাশের ঢেউ, ফেনা বা সমুদ্রপৃষ্ঠের ক্লাটারের সাথে মিশে যায়, ফলে লক্ষ্যবস্তুটি সহজে আলাদা করে চেনা যায় না। এই sea-skimming কৌশল শত্রুর রাডারকে ক্ষেপণাস্ত্রটি অনেক কম দূরত্বে এসে দেখা দিতে বাধ্য করে, ফলে প্রতিরক্ষাকারীর কাছে প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় হাতে থাকে মাত্র কয়েক সেকেন্ড।


পৃথিবীর বক্রতাকে কাজে লাগিয়ে রাডার-হরাইজনের বাইরে থাকা
রাডারের তরঙ্গ সরলরেখায় চলে, কিন্তু পৃথিবী বক্র। ব্রহ্মোস যখন জলের খুব কাছে সমুদ্রপৃষ্ঠ বরাবর ছুটে আসে, তখন পৃথিবীর বক্রতার কারণে রাডারের দৃষ্টিসীমার নিচে লুকিয়ে থাকে। এই কারণে দূরবর্তী রাডার ক্ষেপণাস্ত্রটিকে দেখতে পায় না যতক্ষণ না এটি রাডার-হরাইজন পেরিয়ে খুব কাছে চলে আসে। ব্রাহ্মোস যেহেতু ম্যাক ৩ গতিতে এগোয়, তাই একবার দৃশ্যমান হওয়ার পর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার হাতে প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত সীমিত সময় থাকে।


স্থলভাগে টেরেইন-মাস্কিং: প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার
স্থলভাগে ব্রাহ্মোস একইভাবে পাহাড়, ঢাল, উপত্যকা, বনভূমির মতো প্রাকৃতিক ভূ-প্রকৃতিকে ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করে। এসব ভূ-গঠন রাডারের সিগন্যালকে বাধা দেয়, ফলে দূরপাল্লার সেন্সর ক্ষেপণাস্ত্রটিকে নিয়মিত ট্র্যাক করতে পারে না। Terrain-masking কৌশল দীর্ঘ সময় ক্ষেপণাস্ত্রটিকে অদৃশ্য রাখে, যাতে শত্রুপক্ষ কোনও পূর্বাভাস ছাড়াই আক্রমণের মুখে পড়ে।


নিচু উচ্চতায় নিরাপদে উড়তে সুনির্দিষ্ট রাডার অল্টিমিটার
এত কম উচ্চতায় উড়লে সামান্য ভুলই বিপজ্জনক হতে পারে। এজন্য ব্রাহ্মোসে উন্নত রাডার অল্টিমিটার থাকে, যা প্রতি মুহূর্তে নিচের পৃষ্ঠের সঠিক দূরত্ব মাপে। সমুদ্রের ঢেউ বা পাহাড়ি ঢালের তারতম্য অনুযায়ী অটোপাইলট ক্ষেপণাস্ত্রের উচ্চতা তাৎক্ষণিকভাবে সামঞ্জস্য করে নেয়। এই অত্যন্ত সূক্ষ্ম উচ্চতা-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই sea-skimming এবং terrain-masking—দুটোকেই সফল করে।


নিচু–উচ্চতার পথ অনুসরণে ইনর্শিয়াল ও স্যাটেলাইট নেভিগেশন
ব্রাহ্মোস ইনর্শিয়াল নেভিগেশন সিস্টেম, স্যাটেলাইট নির্দেশনা এবং অনবোর্ড কম্পিউটারের সমন্বিত ব্যবস্থায় প্রোগ্রাম করা জটিল পথ অনুসরণ করে। পাহাড়ের ধার ঘেঁষে বা উপকূল বরাবর অতি নিচ দিয়ে উড়ে রাডারের কভারেজ এলাকা এড়িয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে লক্ষ্যবস্তুতে সর্বোত্তম কোণ থেকে আঘাত করার পথ হিসেব করে নেয় তার নির্দেশ সিস্টেম।


চূড়ান্ত পর্যায়ের উচ্চগতির ম্যানুভার: ট্র্যাক করা প্রায় অসম্ভব
টার্মিনাল ফেজে ব্রাহ্মোস অত্যন্ত উচ্চ গতিতে হঠাৎ বাম-ডান বা উল্লম্ব মুভমেন্ট করে। এই অনিশ্চিত ম্যানুভার শত্রুর ফায়ার-কন্ট্রোল রাডারকে বিভ্রান্ত করে, কারণ লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান প্রতি সেকেন্ডে দ্রুত বদলে যায়। ম্যাক ৩ গতিতে এগোনো ক্ষেপণাস্ত্রকে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে থামানো অত্যন্ত কঠিন—বিশেষত যখন এটি শেষ মুহূর্তে দৃশ্যমান হয়।


Sea-skimming, terrain-masking, সূক্ষ্ম অল্টিমেট্রি, উন্নত নেভিগেশন এবং উচ্চগতির টার্মিনাল ম্যানুভার—এই পাঁচ স্তরের সমন্বিত কৌশল ব্রাহ্মোসকে বিশ্বের অন্যতম কঠিন-লক্ষ্যবস্তু ক্ষেপণাস্ত্রে পরিণত করেছে। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী বহু পরীক্ষায় এই কৌশলগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করেছে। ফলে ব্রাহ্মোস আজ একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য, দ্রুত, সুনির্দিষ্ট এবং শত্রু প্রতিরক্ষা ভেদে সক্ষম আঘাতমূলক অস্ত্র হিসেবে স্বীকৃত।