আজকাল ওয়েবডেস্ক: দিল্লি ও সংলগ্ন অঞ্চলের বায়ুদূষণ এমন এক চরমে পৌঁছেছে যে দেশের সর্বোচ্চ বিচার বিভাগীয় পদে থাকা ব্যক্তিও এর প্রভাব থেকে রেহাই পাননি। “আমি এক ঘণ্টা হাঁটতে গিয়েছিলাম। শরীর খারাপ লাগছিল,”—এই সপ্তাহে আদালতে মন্তব্য করেন দেশের প্রধান বিচারপতি সুর্যকান্ত। সাধারণ নাগরিক নয়, দেশের প্রধান বিচারপতির মুখে এমন মন্তব্যই বুঝিয়ে দেয় পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ।

দ্যা ওয়্যার-এর  বিশেষ প্রতিবেদন অনুসারে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দিল্লি-এনসিআরের AQI ৪০০ থেকে ৫০০–এর ঘরে ঘোরাফেরা করছে। ২৯ নভেম্বর দুপুর ১২টায় AQI ছিল ৩২৬—যা ‘খারাপ’ পর্যায়, এবং সাড়ে ৩টায় নেমে ১৫৯–এ এলে এটিকে বলা হয় ‘অস্বাস্থ্যকর’। তাও ভারত যে তুলনামূলকভাবে  বেশি শিথিল মানদণ্ডে AQI পরিমাপ করে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এই অবস্থা আরও উদ্বেগজনক।

এদিকে কেবল বিচার বিভাগ নয়, রাজনৈতিক মহলও বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে। বিরোধী দলনেতা কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী দিল্লির কিছু মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যাঁরা জানান তাঁদের সন্তানেরা বিষাক্ত বাতাসে বড় হচ্ছে। রাহুল গান্ধী এক ভিডিও বার্তায় বলেন, এই মায়েরা “ক্লান্ত, ভীত ও ক্ষুব্ধ" এবং সংসদের শীতকালীন অধিবেশনেই এই বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ বিতর্ক চান। তাঁর বক্তব্য—“জনগণ সরকারকে চাপে ফেলতে পারছে না, কারণ যারা দূষণ ঘটাচ্ছে তারাই ক্ষমতাশালী—শিল্পপ্রতিষ্ঠান-সহ অন্যান্য শক্তি।”

দীপাবলির পর থেকেই বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যম দূষণ বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করছিল। দিল্লি সরকার সবুজ আতশবাজির পক্ষ নিয়েছিল এবং সুপ্রিম কোর্টও তা অনুমোদন করেছিল। এরপর থেকেই সরকারি মনিটরিং স্টেশনগুলো ভয়াবহ দূষণের তথ্য প্রকাশ করতে শুরু করে।

স্কুল বন্ধ হওয়া, হাসপাতালগুলোতে শ্বাসকষ্টের রোগীর সংখ্যা বাড়া, বারবার AQI এর গুরুতর মাত্রা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সংকটজনক হলেও কার্যকর পদক্ষেপ এখনো চোখে পড়ছে না।

এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। বিশেষ করে কারণ দিল্লি সরকারের দায়িত্বেই দূষণের বড় উৎসগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা সম্ভব—এবং ঠিক সেই জায়গায় নীরবতার অভিযোগ উঠছে।

৯ নভেম্বর ইন্ডিয়া গেটে প্রথম আন্দোলন হয়, যেখানে মা-বাবা ও শিশুদের নিয়ে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানায়। “প্রতি তিনটি শিশুর একটি ক্ষতিগ্রস্থ ফুসফুস নিয়ে বড় হচ্ছে,"—এমন কথা বলতে শোনা যায় বিক্ষোভকারীদের। তাঁদের দাবি ছিল—তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা, কঠোর বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

কিন্তু জনমতকে সমর্থন করার পরিবর্তে, পুলিশ সেদিনের বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে— অভিযোগ ছিল অনুমতি ছাড়া বিক্ষোভ। পরে অবশ্য তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

২৩ ও ২৪ নভেম্বর দ্বিতীয় দফা বিক্ষোভ হয়। এবার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। পুলিশ অভিযোগ করে—বিক্ষোভস্থলে পেপার স্প্রে ছোড়া হয়েছে এবং যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে। এমনকি অভিযোগ তোলা হয় যে বিক্ষোভকারীরা নিহত এক মাওবাদী নেতার পোস্টার বহন করছিল। দুটি এফআইআর হয় এবং প্রায় দুই ডজন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ধারায় “জাতীয় ঐক্যের পরিপন্থী কার্যকলাপ”-এর অভিযোগ আনা হয়।

এই অবস্থাতেই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রাহুল গান্ধী। তিনি দাবি করেন—একটি কঠোর, কার্যকর জাতীয় অ্যাকশন প্ল্যান জরুরি। “ভারতের শিশুরা পরিষ্কার বাতাস পাওয়ার অধিকারী, অজুহাত নয়,”—লিখেছেন তিনি।

সরকার অবশ্য দাবি করছে যে কাজ চালু আছে। জুনে ঘোষিত Air Pollution Mitigation Plan 2025–এর আওতায় আইআইটি কানপুরের সঙ্গে কৃত্রিম বৃষ্টি ঘটানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। ধুলো নিয়ন্ত্রণে ছিটানো জল নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে— অভিযোগ উঠেছে মনিটরিং স্টেশনের কাছে ছিটিয়ে তথ্যকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

যানবাহন-ভিত্তিক দূষণ কমাতে নতুন DTC বাস ও ক্লাস্টার বাসের পরিকল্পনা রয়েছে, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হতে সময় লাগবে ২০২৬ থেকে ২০৩১ পর্যন্ত। এর মধ্যে পুরনো ১০ বছরেরও বেশি ব্যবহৃত CNG বাস এখনো রাস্তায় চলছে।

দিল্লি মেট্রোর যাত্রীর হারও কমছে—২০১৭ সালের ভাড়া বৃদ্ধি থেকে শুরু করে চলতি বছরের আগস্টে আরও ভাড়া বাড়ায় মানুষ ব্যক্তিগত বা দূষণ-সৃষ্টিকারী যাতায়াতের দিকে ঝুঁকছে।

এই সবকিছু মিলিয়ে সরকারের নীতিগত বিভ্রান্তি, পরিকল্পনার বিলম্ব এবং যথাযথ বাস্তবায়নের অভাবের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সময় এখনো থাকলেও দ্রুত, কঠোর ও সমন্বিত ব্যবস্থাই দূষণ রোধে একমাত্র পথ।

এদিকে প্রশ্ন একটাই—যখন বিচারপতি, বিরোধী নেতা, নাগরিক, অভিভাবক, চিকিৎসক—সবাই বলছে “বায়ু বিষাক্ত”, তখন সরকারের নীরবতা কি কেবল রাজনৈতিক হিসেব, নাকি প্রশাসনিক ব্যর্থতা?

উত্তর এখনো বাতাসেই ভাসছে—সেই একই দূষিত বাতাসে, যা কোটি মানুষ প্রতিদিন নিশ্বাসে নিচ্ছে।