আজকাল ওয়েবডেস্ক: কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬–২৭-কে কড়া ভাষায় আক্রমণ করলেন কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী পি. চিদাম্বরম। রবিবার দিল্লিতে কংগ্রেস সদর দপ্তরে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, এই বাজেট “অর্থনৈতিক কৌশল এবং অর্থনৈতিক রাষ্ট্রনায়কত্ব—দুটোরই পরীক্ষায় ফেল করেছে” এবং এতে না আছে আর্থিক শৃঙ্খলা, না আছে কোনও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি।
রাজ্যসভার সাংসদ চিদাম্বরম অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় সরকার একদিকে গুরুত্বপূর্ণ খাত ও প্রকল্পে বরাদ্দ কমিয়েছে, অন্যদিকে উল্লেখযোগ্যভাবে ছাঁটাই করেছে পুঁজিখরচ (capital expenditure)। তাঁর কথায়, “এই বাজেট কোনও সাহসী আর্থিক সংহতির (fiscal consolidation) অনুশীলন নয়।”
অর্থনৈতিক বাস্তবতা এড়িয়ে গিয়েছে বাজেট বক্তৃতা?
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের বাজেট বক্তৃতার কড়া সমালোচনা করে চিদাম্বরম বলেন, দেশের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একাধিক গুরুতর অর্থনৈতিক সমস্যার কোনও উল্লেখই সেখানে নেই। বিশেষ করে তিনি তুলে ধরেন—
চিনের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা দণ্ডমূলক শুল্ক (penal tariffs) এবং তার প্রভাব। ব্যঙ্গাত্মক সুরে তিনি বলেন, “আমি নিশ্চিত নই সরকার আদৌ অর্থনৈতিক সমীক্ষা (Economic Survey) পড়েছে কি না। আর যদি পড়ে থাকে, তবে মনে হয় তারা সেটাকে পুরোপুরি বাতিল করে মানুষের দিকে শুধু শব্দ ছুড়ে মারাকেই—সাধারণত সেকেলে শব্দ—নিজেদের প্রিয় বিনোদন হিসেবে বেছে নিয়েছে।”
‘১০টি বড় চ্যালেঞ্জ—একটাও সমাধান নেই’
চিদাম্বরম বলেন, অর্থনৈতিক সমীক্ষা এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা অন্তত ১০টি বড় চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছেন, যেগুলির কোনওটিই বাজেটে যথাযথভাবে মোকাবিলা করা হয়নি। তাঁর তালিকায় রয়েছে—
১. যুক্তরাষ্ট্রের দণ্ডমূলক শুল্ক, যা বিশেষত রপ্তানিনির্ভর শিল্পকে চাপে ফেলছে
২. দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক বাণিজ্য সংঘাত, যা বিনিয়োগের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে
৩. চিনের সঙ্গে বাড়তে থাকা বাণিজ্য ঘাটতি
৪. মোট স্থায়ী পুঁজি গঠনের (GFCF) হার প্রায় ৩০ শতাংশে আটকে থাকা এবং বেসরকারি ক্ষেত্রের বিনিয়োগে অনীহা
৫. বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI)-এর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ (FPI) বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা
৬. অত্যন্ত ধীর আর্থিক সংহতি, রাজস্ব ও আর্থিক ঘাটতি FRBM লক্ষ্যমাত্রা লঙ্ঘন করছে
৭. সরকারি মুদ্রাস্ফীতি তথ্যের সঙ্গে সাধারণ মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবহণ খরচের বাস্তব অভিজ্ঞতার ফারাক
৮. লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং টিকে থাকা সংস্থাগুলির অস্তিত্ব সংকট
৯. কর্মসংস্থানের ভয়াবহ অবস্থা, বিশেষ করে যুব বেকারত্ব
১০. দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারা পৌর ও নগর পরিকাঠামোর অবনতি
অর্থমন্ত্রী একের পর এক নতুন প্রকল্প, মিশন ও কর্মসূচি ঘোষণার প্রবণতা নিয়েও কটাক্ষ করেন চিদাম্বরম। “অর্থমন্ত্রী নতুন প্রকল্প যোগ করতে ক্লান্ত নন। কিন্তু এর অনেকগুলোই সম্ভবত আগামী বছরের মধ্যেই বিস্মৃত হবে এবং হারিয়ে যাবে,” বলেন তিনি। তাঁর মতে, সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো—এই বাজেট ঠিক কীভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি।
আয়কর সংক্রান্ত প্রস্তাবের প্রসঙ্গে চিদাম্বরম স্মরণ করিয়ে দেন, নতুন আয়কর আইন, ২০২৬—যা ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা—পাস হওয়ার কয়েক মাস পরেও অর্থমন্ত্রী কেবলমাত্র কিছু হারের ‘খুচরো রদবদল’ করেছেন। তিনি বলেন, “এই ছোট ছোট পরিবর্তনের প্রভাব খুঁটিয়ে দেখা দরকার। তবে মনে রাখতে হবে, দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আয়কর বা আয়করের হারের সঙ্গে কোনও সরাসরি সম্পর্কই নেই।”
চিদাম্বরমের বক্তব্যে স্পষ্ট, কংগ্রেস এই বাজেটকে শুধুমাত্র আর্থিক নথি হিসেবে নয়, বরং সরকারের সামগ্রিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হিসেবেই দেখছে—আর সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ বলেই চিহ্নিত করছে।
