খবরের শিরোনামে ‘এল নিনো’ নামটি আসার অনেক আগেই তা নীরবে সমুদ্রের বুকে দানা বাঁধতে শুরু করে। মহাকাশের দূর কক্ষপথ থেকে একটি কৃত্রিম উপগ্রহ তরঙ্গ ধরে ধরে এই বছরের এল নিনোর রূপান্তর পর্যবেক্ষণ করেছে। ২০২৬ সালের জুনেই এল নিনোর আগমন ঘটেছে এবং উপগ্রহের তথ্য বলছে, দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
2
11
নাসার দেওয়া এই পর্যবেক্ষণ তথ্য কেবল সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা পরিমাপের চেয়েও গভীরের তাপ সঞ্চয়ের চিত্র তুলে ধরেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দিয়ে যা বোঝা যায় না, সমুদ্রপৃষ্ঠের সামান্য উচ্চতা বৃদ্ধি দিয়ে তা স্পষ্ট ধরা পড়ে।
3
11
জল গরম হলে প্রসারিত হয়, ফলে নির্দিষ্ট এলাকার সমুদ্রপৃষ্ঠ সামান্য স্ফীত বা উঁচু হয়ে ওঠে। এই তথ্যই বিজ্ঞানীদের নিশ্চিত করে যে জলের গভীরে প্রচুর পরিমাণে তাপ সঞ্চিত হচ্ছে।
4
11
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ও নাসার যৌথ উদ্যোগে প্রেরিত ‘সেন্টিনেল-৬ মাইকেল ফ্রেইলিচ’ উপগ্রহটি ২০২০ সাল থেকে পৃথিবীর মহাসাগরগুলোর ওপর নজর রাখছে। প্রতি ১০ দিনে এটি বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার সূক্ষ্ম পরিমাপ পাঠায়।
5
11
কেলভিন তরঙ্গের উৎপত্তি ও প্রভাব চলতি বছরের গোড়ার দিকেই এল নিনোর প্রাথমিক লক্ষণগুলো ফুটে উঠেছিল। জানুয়ারি ও মার্চ মাসে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে ‘কেলভিন তরঙ্গ’—যা শত শত মাইল চওড়া উষ্ণ জলের এক বিশাল প্রবাহ—তৈরি হয়ে পূর্ব দিকে ধাবিত হতে থাকে। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে পেরুর উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠ স্বাভাবিকের চেয়ে ৫.৯ ইঞ্চিরও বেশি উঁচুতে অবস্থান করছিল।
6
11
প্রশান্ত মহাসাগরের বাণিজ্য বায়ু দুর্বল হয়ে বিপরীতমুখী প্রবাহিত হলে এই কেলভিন তরঙ্গের সৃষ্টি হয়। এটি মহাসাগরের উষ্ণ জলকে পূর্ব দিকে ঠেলে দেয়, সমুদ্রের গভীরের শীতল জলের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দেয় এবং পরিবেশের ভারসাম্য বদলে দেয়।
7
11
১৯৯৭ সালের তীব্রতার স্মৃতি পুনরাবৃত্তি? নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির গবেষক সেভারিন ফোর্নিয়ারের মতে, ২০২৬ সালের জুন মাসের মহাসাগরীয় পরিবেশ ১৯৯৭ সালের সেই চরম এল নিনো পরিস্থিতির মতো দেখায়। ১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনো শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাই বাড়ায়নি, বরং সামগ্রিক সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ধ্বংস করে দিয়েছিল।
8
11
ওই সময় ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের প্রধান উপাদান ‘ক্লোরোফিল’-এর পরিমাণ রেকর্ড পরিমাণ কমে যায়, যার ফলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও মৎস্য শিল্প মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছিল।
9
11
তবে এল নিনো বিদায় নেওয়ার পর এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে। এর স্থলাভিষিক্ত হওয়া 'লা নিনা'-র সময় সামুদ্রিক লৌহ উপাদানের প্রবাহ বেড়ে যায়, যার ফলে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন এক লাফে স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পায়। একে বিজ্ঞানীরা বলেন "পোস্ট-এল নিনো ক্লোরোফিল রিবাউন্ড"।
10
11
কৃত্রিম উপগ্রহের আগাম বার্তার গুরুত্ব মহাকাশ থেকে এল নিনোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ কেবল প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়; এটি আবহাওয়াবিদদের খরা, বন্যা কিংবা বাস্তুতন্ত্রের বিপর্যয় ঘটার বহু আগেই প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।
11
11
আগাম সতর্কতা উপকূলীয় সম্প্রদায়, জেলে ও গবেষকদের আসন্ন ঝুঁকির মোকাবিলা করতে এবং ভবিষ্যতের পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা সাজাতে সাহায্য করে।