জীবিকা হারানো মানুষের আকুতি শুনেছিলেন বিঘ্নহর্তা, বিশ্বাস একবার দর্শনেই দুঃখনাশ, মুম্বইয়ের 'লালবাগচা রাজা' এত বিখ্যাত কেন?
নিজস্ব সংবাদদাতা
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯ : ৫৮
শেয়ার করুন
1
12
মুম্বইয়ের গণেশোৎসব বলতেই যে কয়েকটি নাম সবার আগে মনে আসে, তার মধ্যে অন্যতম লালবাগচা রাজা। প্রতি বছর এই গণেশমূর্তির দর্শনের জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তরা মুম্বইয়ে ভিড় করেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে বাপ্পার দর্শন পাওয়ার অপেক্ষা করেন তাঁরা।
2
12
কিন্তু যে গণেশমূর্তিকে ঘিরে আজ এত উন্মাদনা, তার জন্মকথা শুরু হয়েছিল একেবারে অন্য এক সংকট থেকে। এই বিখ্যাত গণেশমূর্তি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল কোনও জাঁকজমকপূর্ণ মণ্ডপ বা তারকাখচিত উৎসব দিয়ে নয়।
3
12
এর পিছনে রয়েছে বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়া, জীবিকা হারানোর আশঙ্কা এবং কয়েকজন সাধারণ মানুষের আন্তরিক মানত, যাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন, বিঘ্নহর্তা গণেশ তাঁদের দুঃসময় দূর করবেন।
4
12
গল্পটা ১৯৩২ সালের। মুম্বইয়ের লালবাগ এলাকার পেরু চাওলের কাছে একটি বাজার বন্ধ হয়ে যায়। এই বাজারের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মৎস্যজীবীদের জীবিকা। বিশেষ করে কোলি সম্প্রদায়ের বহু মানুষ এই বাজারের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের সামনে তৈরি হয় বড়সড় অনিশ্চয়তা।
5
12
পরিস্থিতি বদলের আশায় স্থানীয় মানুষ গণেশের কাছে প্রার্থনা করেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, বিঘ্নহর্তা তাঁদের পথ দেখাবেন৷ তাঁরা মানত করেন জীবিকার পথ আবার খুলে গেলে তাঁরা গণেশের উদ্দেশে বিশেষভাবে পুজো করবেন। ভক্তদের প্রার্থনা ও প্রচেষ্টায় সেই আশা পূরণ হয় এবং পরবর্তীকালে সেখানে তৈরি হয় বর্তমান লালবাগ মার্কেট। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, গণপতির কৃপাতেই এই অসম্ভব কাজ সম্ভব হয়েছে।
6
12
শেষ পর্যন্ত নতুন করে বাজার তৈরি হওয়ার পথ খুলে যায়। আর সেই কৃতজ্ঞতা থেকেই শুরু হয় এক বিশেষ গণেশ আরাধনা।১৯৩৪ সালের সেপ্টেম্বরে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মৎস্যজীবীদের উদ্যোগে গণেশমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। মৎস্যজীবীদের সঙ্গে এলাকার সম্পর্কের কথা মাথায় রেখে মূর্তির সাজসজ্জাতেও সেই পরিচয়ের ছাপ রাখা হয়েছিল। মৎস্যজীবীদের ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে সেই মূর্তিকে দেওয়া হয়েছিল জেলেদের পোশাকের আদল।
7
12
তৈরি হয় লালবাগচা রাজা সার্বজনিক গণেশোৎসব মণ্ডল। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে এই গণেশমূর্তি পরিচিত হয়ে ওঠে ‘নবসাচা গণপতি’ নামে। অর্থাৎ ভক্তদের বিশ্বাস, বাপ্পার কাছে মানত করলে পূর্ণ হয় মনের ইচ্ছা।কিন্তু এখানেই শেষ নয়।
8
12
লালবাগচা রাজার বর্তমান চেহারার সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে একটি পরিবারের দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৩৫ সাল থেকে এই বিখ্যাত গণেশমূর্তি তৈরি করে আসছে কাম্বলি পরিবার। মধুসূদন দোন্দুজি কাম্বলি এই ঐতিহ্যের সূচনা করেন।
9
12
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই কাজ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে পরিবারটি। ২০১১ সালে লালবাগচা রাজার নকশার জন্য কাম্বলি আর্টস মেধাস্বত্ব সুরক্ষাও পায়।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লালবাগচা রাজা শুধুমাত্র একটি পুজোর মূর্তি থাকেনি। মুম্বইয়ের গণেশোৎসবের অন্যতম বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে।
10
12
প্রতি বছর মুখ দর্শন থেকে শুরু করে চরণ স্পর্শ বা নবস দর্শন—বিভিন্নভাবে বাপ্পার আশীর্বাদ পেতে ভিড় করেন অসংখ্য মানুষ। তবে এই দীর্ঘ যাত্রায় ব্যতিক্রমও এসেছে। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির সময় প্রথাগতভাবে গণেশোৎসব আয়োজন করা হয়নি। তার পরিবর্তে সচেতনতা এবং সামাজিক উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
11
12
আজ লালবাগচা রাজাকে ঘিরে যে বিপুল জনপ্রিয়তা, তার পিছনে শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়, রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রায় এক শতাব্দীর গল্প। একটি বাজার হারানোর ভয় থেকে যে মানতের শুরু, সেটিই আজ মুম্বইয়ের অন্যতম পরিচিত গণেশোৎসবে পরিণত হয়েছে।
12
12
প্রতি বছর দর্শনের জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষ ভিড় করেন। মুখ দর্শন এবং চরণ স্পর্শ বা নবস দর্শনের জন্য থাকে আলাদা ব্যবস্থা। বহু ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও ভক্তরা বাপ্পার দর্শনের অপেক্ষা করেন, কারণ তাঁদের বিশ্বাস—এক ঝলক দর্শনেই মন শান্ত হয়, আর গণেশের আশীর্বাদে জীবনের দুঃখ-কষ্ট লাঘব হয়।