দুর্গাপুজো মানেই আনন্দ, উৎসব আর দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের অপেক্ষা। প্রতিবছরই পুজোর আগে একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে, এ বছর কোন বাহনে আসছেন মা দুর্গা? আর দশমীতে কোন বাহনে কৈলাসে ফিরে যাবেন তিনি?
2
12
প্রচলিত শাস্ত্রমতে, দেবীর আগমন ও গমনের বাহনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা শুভ-অশুভ ইঙ্গিত। কোথাও সমৃদ্ধি ও শস্যবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে, আবার কোথাও রয়েছে প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিংবা সামাজিক অস্থিরতার প্রতীকী ব্যাখ্যা।
3
12
প্রচলিত শাস্ত্রীয় রীতি অনুযায়ী, দুর্গার আগমনের বাহন নির্ধারিত হয় সপ্তমী তিথি সপ্তাহের কোন বারে পড়ছে, তার ভিত্তিতে। একই ভাবে, দশমী তিথি যে বারে পড়ে, সেই অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয় দেবীর গমনের বাহন। এই হিসেবের জন্য একটি বহুল প্রচলিত শ্লোক রয়েছে—“শশিসূর্যে গজারূঢ়া, শনিভৌমে তুরঙ্গমে।গুরৌ শুক্রে চ দোলায়াং, বুধে নৌকা প্রকীর্তিতা॥”
4
12
এই শ্লোক অনুসারে রবিবার ও সোমবার দেবীর বাহন হাতি, শনিবার ও মঙ্গলবার ঘোড়া, বুধবার নৌকা এবং বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দোলা বা পালকি।
5
12
হাতি: প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, হাতিতে দেবীর আগমন বা গমন হলে পৃথিবী শস্যে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে দেখা হয় এই বাহনকে। সুখ, শান্তি ও প্রাচুর্যের ইঙ্গিতও বহন করে গজ।
6
12
ঘোড়া: ঘোড়ায় দেবীর যাতায়াতের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ‘ছত্রভঙ্গ’-এর ধারণা। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় এর অর্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা কিংবা বিশৃঙ্খলার সম্ভাবনা।
7
12
নৌকা: নৌকায় দেবীর আগমন বা গমন হলে জলবৃদ্ধি ও শস্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যায় বলে প্রচলিত বিশ্বাস। বৃষ্টির জলে কৃষিক্ষেত্র উপকৃত হয়ে ফসলের উৎপাদন বাড়তে পারে। তবে অতিবৃষ্টি ও বন্যার আশঙ্কার কথাও এই ব্যাখ্যায় উঠে আসে।
8
12
দোলা বা পালকি: এই বাহনকে শাস্ত্রীয় লোকবিশ্বাসে অশুভ লক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। মড়ক, মহামারি কিংবা সমাজজীবনে নানা প্রতিকূলতার ইঙ্গিত হিসেবে এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।
9
12
২০২৬ সালের দুর্গাপুজোয় দেবীর গমনের বাহন নিয়ে পঞ্জিকাগুলির মধ্যে মতভেদ নেই। দশমী তিথি বুধবার পড়ায় প্রচলিত নিয়ম অনুসারে মা দুর্গার বাহন হবে নৌকা।শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নৌকায় দেবীর গমন জলবৃদ্ধি ও শস্যবৃদ্ধির প্রতীক। অর্থাৎ, একদিকে কৃষিক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জলের জোগান এবং ভালো ফসলের সম্ভাবনার কথা বলা হয়, অন্যদিকে অতিবৃষ্টি ও বন্যার মতো পরিস্থিতির আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়। তবে এগুলি ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রচলিত শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা, নিশ্চিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস নয়।
10
12
২০২৬ সালে দেবীর আগমনের বাহন নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পঞ্জিকায় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী, সপ্তমী পড়েছে রবিবার। সেই হিসেব মেনে দেবী দুর্গার আগমনের বাহন হবে হাতি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, গজে আগমন শস্যসমৃদ্ধি, সুখ ও প্রাচুর্যের প্রতীক।
11
12
অন্যদিকে, গুপ্ত প্রেস-সহ কয়েকটি পঞ্জিকার হিসেব অনুযায়ী, সপ্তমী পড়েছে শনিবার। সেই নিয়ম অনুসারে দেবীর আগমনের বাহন হবে ঘোড়া। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় ঘোটকে আগমনকে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ফলে ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোয় দেবীর আগমনের বাহন নিয়ে পঞ্জিকাভেদে দুটি আলাদা মত উঠে আসছে। একদিকে হাতি, অন্যদিকে ঘোড়া— দুই বাহনের ফলাফলও প্রচলিত বিশ্বাসে সম্পূর্ণ আলাদা।
12
12
দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার নয়, এটি মিলন, আনন্দ ও নতুন করে বাঁচার উদ্যাপন। দেবীর আগমন ও গমনের বাহন নিয়ে প্রচলিত বিশ্বাস বহুদিন ধরেই বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। তবে বাহনের সঙ্গে যুক্ত শুভ-অশুভের ব্যাখ্যাকে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে দেখা উচিত নয়।