ভাবুন তো, কয়েক হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত খোলা সমুদ্র, চারদিকে শুধু ঢেউ আর ঢেউ—তার মাঝেই ভেসে চলেছে এক বিশাল লবণজলের কুমির! শুনতে সিনেমার গল্পের মতো লাগলেও, সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, বাস্তবেই এমন দুঃসাহসিক যাত্রা করেছিল লবণজলের কুমির বা সল্টওয়াটার ক্রোকোডাইল। আর সেই দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা শেষে তারা পৌঁছেছিল ভারত মহাসাগরের দূরবর্তী দ্বীপপুঞ্জ সেশেলসে।
2
9
বিশ্বের সবচেয়ে বড় জীবিত সরীসৃপ হিসেবে পরিচিত লবণজলের কুমির সাধারণত অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় উপকূলবর্তী অঞ্চলে দেখা যায়। এতদিন ধারণা ছিল, তারা মূলত নদী, মোহনা এবং উপকূলেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু নতুন গবেষণা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
3
9
বিজ্ঞানীরা জীবাশ্ম, প্রাচীন হাড়ের নমুনা এবং জেনেটিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন, হাজার হাজার বছর আগে কিছু কুমির খোলা সমুদ্র পেরিয়ে দ্বীপে পৌঁছেছিল। সেশেলসের মতো বিচ্ছিন্ন দ্বীপে কুমিরের উপস্থিতি প্রমাণ করে, তারা শুধু সাঁতারেই পারদর্শী নয়, দীর্ঘ সময় ভেসে থেকেও টিকে থাকতে পারে।
4
9
গবেষকদের মতে, লবণজলের কুমিরদের শরীর এমনভাবে গঠিত যে তারা নোনাজলে সহজেই বেঁচে থাকতে পারে। তাদের শরীরে বিশেষ গ্রন্থি রয়েছে, যা অতিরিক্ত লবণ বের করে দেয়।
5
9
ফলে সমুদ্রে কয়েক সপ্তাহ বা এমনকি কয়েক মাসও তারা টিকে থাকতে পারে। এছাড়া, তারা স্রোত ও জোয়ারের দিক ব্যবহার করে শক্তি বাঁচিয়ে দূরত্ব অতিক্রম করে।
6
9
সম্ভবত ঝড়, সাইক্লোন বা প্রাকৃতিক স্রোতের টানে তারা ভেসে দূর সমুদ্রে চলে গিয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে ভেসে বা সাঁতরে পৌঁছে যায় সেশেলসের দ্বীপে। এই ঘটনা শুধু তাদের শক্তি ও সহনশীলতার প্রমাণই নয়, বরং প্রাণীদের বিস্তারের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
7
9
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই আবিষ্কার আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কীভাবে প্রাচীন যুগে বিভিন্ন প্রাণী দূরবর্তী দ্বীপে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছিল। আগে মনে করা হত, এমন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে প্রাণীদের পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। কিন্তু কুমিরদের এই অভিযাত্রা প্রমাণ করে, প্রকৃতি অনেক সময় আমাদের কল্পনার চেয়েও বেশি চমকপ্রদ।
8
9
এছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো ভবিষ্যতে প্রাণীদের চলাচলের ধরণ আরও বদলে দিতে পারে বলে সতর্ক করছেন গবেষকরা। ফলে নতুন অঞ্চলে কুমিরের মতো বড় শিকারির উপস্থিতি স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।
9
9
সব মিলিয়ে, সেশেলসে লবণজলের কুমিরের উপস্থিতি যেন এক রহস্যময় অভিযানের গল্প—যেখানে প্রকৃতি, টিকে থাকা আর অভিযোজন ক্ষমতা মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অবিশ্বাস্য কাহিনি। সত্যিই, বন্যপ্রাণীর জগতে এখনও কত অজানা অধ্যায় লুকিয়ে আছে, তা এই গবেষণাই আবার মনে করিয়ে দিল।