বাংলা চলচ্চিত্র জগতের ‘স্ট্রাগলার’ অর্থাৎ উঠতি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের তরফ থেকে ইন্ডাস্ট্রির সিস্টেম এবং শীর্ষস্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দেওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে ‘স্ট্রাগলার’ অর্থাৎ তরুণ ও স্বতন্ত্র শিল্পী ও নির্দেশকদের তরফ থেকে ইন্ডাস্ট্রির ক্ষমতার অলিন্দে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেওয়ার ঘটনা যেন এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়েছে। স্বরূপ বিশ্বাস ও অরূপ বিশ্বাসের মতো হেভিওয়েট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ‘অঙ্গুলিহেলনে’ ফেডারেশনের নিয়মের নানান কড়াকড়ি, তরতাজা তরুণ প্রতিভাদের কাজ কেড়ে নেওয়া এবং বহু স্বতন্ত্র ছবির মুক্তি আটকে যাওয়ার নজির ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন নয়। কিন্তু এই রাজনৈতিক ক্ষমতার পাশাপাশি আরও এক ভয়ঙ্কর চোরাস্রোত নিঃশব্দে গ্রাস করছে টলিউডকে। আর তা হলো— একের পর এক ছবি বা সিরিজে দারুণ অভিনয় করে সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েও, হঠাৎ করেই টলিউড থেকে নিখোঁজ বা কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছেন একঝাঁক প্রতিভাবান অভিনেতা-অভিনেত্রী। ঠিক কোথায় গলদ? এবং কাদের? কেন যোগ্যরা কাজ পাচ্ছেন না? এহেন সমস্যার কি একেবারেই কোনও  নেই? খোঁজ নিল আজকাল ডট ইন।  

অভিনেত্রী শ্রীতমা দে। অভিনেত্রীকে এর আগে দর্শক ‘সাহেবের কাটলেট’ ও ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’ ছবিতে দেখেছেন। সুব্রত সেন পরিচালিত ‘সমরেশ বসুর প্রজাপতি’ ছবিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল তাঁকে। সে ছবি আবার ২৮তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হয়েছিল। এছাড়াও ওয়েব সিরিজেও দেখা গিয়েছে তাঁকে। কিন্তু ওই যে নিয়মিত নয়। অভিনেত্রীর প্রতিটি কাজের মধ্যে সময়ের ফারাক বিস্তর। অথচ তাঁর অভিনয় কিন্তু প্রশংসিত সমালোচকমহলে। আজকাল ডট ইন-কে শ্রীতমা বললেন, “মফস্‌সল থেকে কলকাতায় এসে ইন্ডাস্ট্রিতে ভাগ্যান্বেষণে নেমেছিলাম। অভিনয়ের প্রতি ভালবাসা ছিলই কিন্তু পড়াশোনার পাট চুকোনোর পর আচমকা একদিন এই জগতে চলে এলাম। ভালবাসা বাড়ল, অভিনয় শেখ-বোঝার চর্চা মন দিয়ে শুরু করলাম। আট বছর পরেও  পায়ের নীচের জমি এখনও সেই অর্থে পোক্ত হয়নি। কেন পোক্ত হয়নি, সে প্রশ্নের জবাব নিজেরও জানা নেই। অভিনেত্রী হিসেবে সাহেবের কাটলেট এবং দোঁয়াশ ছবিতে কাজ করে খুব আনন্দ পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এই ছবি দু'টিতে কাজ করার নিরিখে আরও কাজ পাওয়ার আশা করেছিলাম। কিন্তু হয়নি। ইন্ডাস্ট্রিতে সম্পর্কের নিরিখে কাজ পাওয়া যায়, আত্মপ্রচার করলেও অনেক সময় কাজ হয়।  ওই দুটোর একটিও পারি না বলেই হয়তো ইন্ডাস্ট্রি আমাকে গুরুত্ব দেয় না।” হাসতে হাসতে এ কথা বললেও তার মধ্যেই স্পষ্ট চাপা দুঃখ আর মনখারাপের ঝলক।  

 

অডিশন দিলেও আচমকা কোনও কারণ না জানিয়েই বড় নামের কোনও অভিনেতাকে সেই চরিত্র দিয়ে দেওয়া হয় বলে শ্রীতমার অভিযোগ। “অডিশন দিতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। অডিশন তো দিই। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখি আচমকা নামি কেউ আমাকে প্রস্তাবিত চরিত্রটি পেয়ে গেল। আমাকের কোনও কারণ বলা হয়নি। আমিও ঘাঁটাই না, কারণ কেউ খোলসা করে বলবে না। প্রতিটি প্রজেক্টে আগেরটির থেকে ভাল কাজ করার চেষ্টা করি নিজেকে নিংড়ে দিয়ে। তারপরেও দেখি যেই কে সেই!আর একটা কথা, সমাজমাধ্যমে আমার খুব একটা ফলোয়ার্স নেই।এখন তো দেখি, সমাজমাধ্যমে ফলোয়ার্স দেখে অনেক ক্ষেত্রে অভিনেতা-অভিনেত্রী বাছাই করা হচ্ছে! তাই সেদিক থেকেও হয়তো আমি। পিছিয়ে কারণ আমি শিরদাঁড়াটা সোজা রেখে স্রেফ অভিনয়টা জানি। ফলোয়ার্স বাড়িয়ে পরিচিত মুখ হতে জানি না। দেখুন, সাফ সাফ বলছি তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের ভয় আমাদের প্রজন্মের কম বেশি সবার আছে, আমারও রয়েছে। রুজি-রুটির টানে হয়তো অচিরেই নিজের ক্ষিদে মেরে আমাকেও মেগা ধারাবাহিকে নাম লেখাতে হবে বেঁচে থাকার জন্য।” 

তবে ইন্ডাস্ট্রির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর রুদ্রনীল ঘোষ কিংবা পাপিয়া অধিকারীদের মতো সিনিয়র শিল্পীদের প্রতি আশা রাখছেন শ্রীতমা।তাঁর সংযোজন, “সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে। ইন্ডাস্ট্রির অন্দরেও হয়েছে। রুদ্রদা, পাপিয়াদি যেহেতু আমাদের ইন্ডাস্ট্রির পরিবারেরই, তাই তাঁদের প্রতি আমাদের আশা তো আছেই। আর পরিচালক-প্রযোজকদের উদেশ্যে একটাই অনুরোধ- আমার কাজ দেখুন, সেই নিরিখে যতটা সম্ভব সুযোগ দেওয়া যায়, দিন। বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থা তো এক সেট অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে কাজ করে চলেছেন। তার বাইরে বেরোলে আপনাদেরও লাভ, দর্শকের লাভ এবং আমাদেরও লাভ।”

 

 

কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘রক্ত পলাশ’ সিরিজ কিংবা ‘দোঁয়াশ’ ছবির অন্যতম শক্তিশালী অভিনেত্রী মৌসুমী দালাল-ও এই মুহূর্তে প্রায় পুরোপুরি কর্মহীন। বহু বছর থিয়েটার করার পর রুপোলি পর্দায় পা রেখে ওঁর অভিজ্ঞতা অত্যন্ত তিক্ত।একাধিক ছোট ছবি, তথ্যচিত্রতেও কাজ করেছেন মৌসুমী, যখনই সুযোগ পেয়েছেন। মুক্তির অপেক্ষায় পড়ে রয়েছে একটি ছবি।  আজকাল ডট ইন০-কে তিনি বললেন, “আমাকে শুনতে হয়েছে, তোমার শারীরিক গঠন, মুখের আদল শ্রীলা মজুমদারের মতো। তাই সেরকম মাফিক কোনও চরিত্র পেলে অবশ্যই ডেকে পাঠাব তোমাকে। সেই ডাক চট করে আসে না। দিনের পর দিন অডিশন দিই। এবং তাতে আমার বিন্দুমাত্র ক্লান্তি নেই। তবে কথা হল- কোনও অভিনেতাকে যদি প্রথমেই কোনও বিশেষ ধরনের চরিত্রের সঙ্গে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন খোদ নির্মাতারা, তাহলে তো ভারী মুশকিল! আর রূপটানশিল্প, সিনেমার ব্যবহৃত প্রযুক্তিবিদ্যা  যখন এত এগিয়ে গিয়েছে আজকের সময়ে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে কোনও পারফর্মিং শিল্পীকে যদি তাঁর শারীরিক গঠন, রঙের জন্য প্রায় কোনও সুযোগই না আসে তাহলে কী বলা যায় বলুন!” 

 

 

“আমি মফস্‌সলের মেয়ে। অভিনয়ের প্রতি ভালবাসা থেকেই তা শেখার চেষ্টা শুরু করিমঞ্চের হাত ধরে। বহু বছর থিয়েটার করেছি। অথচ পর্দায় কাজ করার সময় নানান সমসের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এটা অবশ্যই সত্যি আমি পরিচিত মুখ নই।” তাঁর  সাফ কথা— নতুন প্রজন্ম থেকে ভাল অভিনেতা তৈরি করার ন্যূনতম দায়িত্বটুকুও কি ইন্ডাস্ট্রির নেই?  ইন্ডাস্ট্রিরর উপরেও তো একটা দায়িত্ব বর্তায় যে আগামী প্রজন্ম থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রী তৈরি করা, তাঁদের সুযোগ দেওয়া। ইন্ডাস্ট্রির একটা বড় অংশের সমস্যা হল, অভিনেত্রী কম বরং ‘বার্বি ডল’ চাই তাঁদের। একটা ঝাঁ চকচকে ব্যাপার আর তার সঙ্গে সমাজমাধ্যমে চোখ টেরিয়ে যাওয়ার মতো ফলোয়ার্স। আর যার এই দুটোই নেই, তার তাহলে কিছুই নেই। যতই অথচ পুঁজিতে তাঁর অভিনয় থাকুক না কেন! দেখুন, চেষ্টা তো চালিয়ে যাবই। আর আশা রাখব, এই রাজনৈতিক পালাবদলের পর আমার রাজনৈতিক রং দেখে কাজ দেওয়া হবে না যেমন, তেমনই প্রতিভা মাপার মানদণ্ডেও যদি কাজ পাওয়া যাবে। এইটুকুই আশা রাখছি।“