বাংলা বিনোদন দুনিয়ায় এক নজিরবিহীন সংঘাতের আবহ। টলিউডের ‘ইন্ডাস্ট্রি’ প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জির সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘অভিমান’-কে কেন্দ্র করে তৈরি হল তীব্র বিতর্ক। ছবিটির ট্রেলার ও টিজার প্রকাশ্যে আসতেই প্রসেনজিতের বিরুদ্ধে সরাসরি ‘অনৈতিক আচরণ’, ‘আইডিয়া ও চরিত্র আত্মসাৎ’ এবং মেসেজ এড়িয়ে যাওয়ার মতো বিস্ফোরক অভিযোগ আনলেন জাতীয় পুরস্কারজয়ী প্রখ্যাত পরিচালক সুমন ঘোষের। সোশ্যাল মিডিয়ায় সুমনের এই খোলা চিঠি টলিউড মহলে কার্যত ভূমিকম্প এনে দিয়েছে। অন্যদিকে, ছবি মুক্তির দিনই প্রসেনজিৎ ও ছবির টিমের পাশে দাঁড়িয়ে পাল্টা বিবৃতি জারি করেছিল ‘অভিমান’-এর প্রযোজনা সংস্থা। এবার করলেন খোদ প্রসেনজিৎ!
ছবি মুক্তির দিনে যখন গোটা স্টুডিও পাড়া এই দ্বন্দ্বে তোলপাড়, ঠিক তখনই অত্যন্ত সংযত অথচ দৃঢ় ভাষায় নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন অভিনেতা প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি। পরিচালক সুমনের আনা সমস্ত অনৈতিকতার অভিযোগকে একপ্রকার উড়িয়ে দিয়ে প্রসেনজিৎ ওঁর বক্তব্যে পেশাদারিত্ব এবং আইনি সত্যতার ওপর জোর দিয়েছেন।
সুমন ঘোষের চিঠির জবাবে প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি ওঁর বিবৃতিতে জানান-“একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে সুমনের প্রতি আমার সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা রয়েছে। আমাদের এই ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক সময়ই সৃজনশীলতার পরিধি একে অপরকে স্পর্শ করে যায়, কারণ আমরা সবাই সার্বজনীন মানবিক আবেগ এবং একই ধরনের বিষয়বস্তু থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়ে গল্প বুনি।”ওঁর আগামী ছবি ‘স্টার’-এর চিত্রনাট্য প্রসেনজিতের মুখস্থ ছিল— সুমনের এই দাবির প্রেক্ষিতে অভিনেতা স্পষ্ট করে বলেন, ‘অভিমান’ সম্পূর্ণভাবে একটি স্বাধীন এবং আইনগতভাবে রেজিস্টার্ড প্রজেক্ট, যা আমাদের পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত এবং লেখক শ্রীজাত তৈরি করেছেন। একজন অভিনেতা হিসেবে আমার কাজ হল কেবল সেই চিত্রনাট্যটিকে পর্দায় জীবন্ত করে তোলা, যা আমার হাতে তুলে দেওয়া হয়।”
কারও বিশ্বাসভঙ্গ করার কোনও উদ্দেশ্য ওঁর ছিল না জানিয়ে প্রসেনজিৎ যোগ করেন, “কারও সৃজনশীল বিশ্বাস বা ভরসার জায়গা নষ্ট করার কোনও উদ্দেশ্য এখানে ছিল না। আমি সুমনের ভবিষ্যতের জন্য সব সময় শুভকামনা জানাব।”

পরিচালক সুমন ঘোষ ওঁর পোস্টে প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জির নাম না করে ওঁর ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানকে উল্লেখ করে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন। সুমনের দাবি, ওঁর আগামী ছবি ‘স্টার’-এর চিত্রনাট্য প্রসেনজিতের মুখস্থ ছিল এবং আড়াই বছর ধরে ওঁর দল এই চরিত্রটি নিয়ে খাটছিল। কিন্তু ‘অভিমান’ ছবির টিজারে হুবহু একই চরিত্রায়ণ ও দৃশ্য দেখে তিনি স্তম্ভিত।প্রসেনজিৎকে বিঁধে সুমনের চিঠিতে বিস্ফোরক দাবি, -“বিবেকের কাছে একবারও কি মনে হল না যে আমাকে অন্তত জানানো উচিত ছিল? তার উপর, যখন আমি বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি, তখন অদ্ভুত এক নিশ্চলতায় আমার মেসেজগুলোকে এড়িয়ে যাচ্ছ তুমি। এখন বুঝতে পারছি, কেন।”
সুমন আরও যোগ করেছেন, “সৌমিত্রকাকু, মিঠুনদা, শর্মিলা ঠাকুর বা অপর্ণা সেনের মতো কিংবদন্তিদের কাছ থেকে প্রফেশনাল এথিক্স শেখা উচিত। একজন লেখক বা পরিচালক যখন আড়াই বছর ধরে তাঁর স্বপ্ন কোনো অভিনেতার সামনে উজাড় করে দেন, তখন প্রতিষ্ঠিত নাম এবং ক্ষমতার জোরে একজন স্বাধীন পরিচালকের আইডিয়া বা ক্যারেক্টারাইজেশনকে এভাবে কি নিঃশব্দে আত্মসাৎ করে নেওয়া যায়? নতুনরা কি আর প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জীদের ওপর ভরসা রাখতে পারবে? তোমার পদ্মশ্রীর যথার্থ মর্যাদা যেন অক্ষুণ্ন থাকে। তোমার নতুন ছবির জন্য শুভকামনা রইল, হোক না তা অনৈতিকতার ওপর দাঁড়িয়ে।”
সুমনের এই অভিযোগ টলিউডের ভেতরের এক গভীর ক্ষতকে সামনে এনে দিয়েছে। কপিরাইট বা আইনি লড়াইয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে সুমন এই প্রশ্নটি তুলেছেন ‘শিল্পের আদিম সততা ও বিশ্বাস’ নিয়ে। পাল্টা যা জবাব দিয়েছেন ‘ইন্ডাস্ট্রি’ও, তা নিয়েই এখন জোর চর্চা চলছে স্টুডিও পাড়ায়। এখন দেখার, ‘অভিমান’ দেখার পর দর্শক ও সমালোচকরা এই দুই ছবির চরিত্রের মিল নিয়ে কী রায় দেন।
















