দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে রয়েছেন তাঁর অগণিত অনুরাগী। আট থেকে আশি— সব বয়সের শ্রোতাই মুগ্ধ তাঁর কণ্ঠের জাদুতে। তবে কেবল মনকেমন করা বা রোমান্টিক গানেই তিনি সীমাবদ্ধ নন; অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে বা নিজের মতামত স্পষ্ট জানাতে কখনও পিছপা হননি গায়ক অরিজিৎ সিং। আরজি কর কাণ্ডের সময় সুরের অস্ত্রেই প্রতিবাদ গড়েছিলেন তিনি। এবারও দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) আন্দোলনের সমর্থনে সরব হয়ে তীব্র চর্চার কেন্দ্রে এই জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রথাগত রাজনৈতিক অবস্থানের উর্ধ্বে প্রশ্ন তোলায় সম্প্রতি একদল তথাকথিত 'ভক্তের' রোষানলে পড়তে হয়েছে অরিজিৎকে। তবে নিজের চেনা ছন্দে ‘পরোয়া করি না’ মনোভাব নিয়ে পাল্টা জবাব দিয়েছেন গায়ক। কটাক্ষের কড়া জবাব তো দিয়েছেনই, পাশাপাশি বাছাই করা শব্দে নীরব করে দিয়েছেন এক উচ্চশিক্ষিত ‘সবজান্তা’ চিকিৎসককেও!
সিজেপি ইস্যুতে আন্দোলনের কথা বলতে গিয়ে দেশে নির্বিচারে গাছ কাটার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন গায়ক। তাতেই চটে যান এক চিকিৎসক। শিল্পী জানান, ওই চিকিৎসককে শিক্ষার্থীদের অবস্থান বোঝাতে গেলে তিনি উল্টে এক ‘সবজান্তা’সুলভ হাবভাব দেখান এবং গাছ কাটার সমর্থনে প্রশ্ন তোলেন— "প্রতিটি গাছ কাটার বদলে নতুন চারা রোপণ করা হচ্ছে কি না, তা কি খোঁজ নিয়েছেন?"
এই যুক্তিতে ক্ষুব্ধ অরিজিৎ জানান, চিকিৎসক হয়েও একজন মানুষের এমন 'বিভ্রান্তিকর' যুক্তি দেখে তিনি স্তম্ভিত! একজন মালি বা উদ্যানপালকও এর চেয়ে ভাল জবাব দিতে পারেন। অরিজিতের কথায়, "একটি শতবর্ষী বা প্রবীণ বৃক্ষ শুধু কিছু কাঠ বা পাতা নয়, তা এক আস্ত বাস্তুতন্ত্রের অভিভাবক। নতুন রোপণ করা চারা গাছ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও, তা কখনই বহু দশকের পুরোনো মহীরুহের বিকল্প হতে পারে না। রাস্তা, অট্টালিকা বা শিল্প কারখানা আবার নতুন করে গড়া যায়; কিন্তু বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাচীন অরণ্যকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। গাছেরা নিজের কথা নিজে বলতে পারে না, তাই নাগরিক হিসেবে এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের হয়ে কথা বলা আমাদেরই দায়িত্ব।"

সামাজিক মাধ্যমে এক ক্ষুব্ধ অনুরাগী অরিজিৎকে উদ্দেশ্যে করে লেখেন, সিজেপি বা সরকারের বিষয় নয়, বরং গায়কের সাম্প্রতিক অবস্থানে তিনি চরম হতাশ। দীর্ঘদিন একনিষ্ঠ ভক্ত থাকার পর এখন তিনি গায়ককে 'ঘৃণা' করেন বলেও দাবি জানান।ভক্তের এই বিষোদ্গার নীরবে সহ্য করেননি শিল্পী। সোজা ব্যাটে জবাব দিয়ে অরিজিৎ স্পষ্ট বলে ওঠেন, "কেউ আমার অনুরাগী বলেই তাঁকে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতে হবে— এমন কোনও বাধ্যবাধকতা আমার নেই। কে আমায় সম্মান করল বা করল না, তা নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র চিন্তিত নই। তবে আপনার অনুভূতিতে আঘাত লেগে থাকলে একজন মানুষ হিসেবে ক্ষমাপ্রার্থী। আমি ভীষণই ক্ষুব্ধ। আমাকে স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য ক্ষমা করবেন! আপনি চাইলে আপনার প্লেলিস্ট থেকে আমার সব গান ডিলিট করে দিতে পারেন এবং আমার অস্তিত্ব ভুলে যেতে পারেন। ভাল থাকুন।"
দিল্লি পুলিশ ও নেতা-মন্ত্রীদের উদ্দেশ্যে সামাজিক মাধ্যমে অরিজিতের তীব্র তোপই এই বিতর্কের মূল সূত্রপাত। আন্দোলনরত ছাত্রদের প্রতি প্রশাসনের আচরণ দেখে তিনি লিখেছিলেন— "হ্যালো নেতা-মন্ত্রী, হ্যালো দিল্লি পুলিশ! আপনারা লজ্জিত নন? কী চলছে এসব? নিজেদের কি ঈশ্বর মনে করছেন? সব মনে রাখা হবে। হর হর মহাদেব! মনে রাখবেন, পরিবর্তনই একমাত্র সত্যি।"
রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে অরিজিতের এই নিরপেক্ষ ও চাঁচাছোলা মন্তব্য অনেকেই মেনে নিতে পারেননি, যার ফলে বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে। তবে একা অরিজিৎ নন— রত্না পাঠক শাহ, নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমির মতো বর্ষীয়ান শিল্পীরাও এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজস্ব ভঙ্গিতে সরব হয়েছেন।
সব মিলিয়ে, বিতর্ক বা ট্রোলিং যাই আসুক না কেন— নিজের নীতি ও স্বাধীন মতাদর্শে যে তিনি বিন্দুমাত্র আপস করবেন না, তা আরও একবার প্রমাণ করে দিলেন দেশের এক নম্বর গায়ক।
















