আইপিএল-এর ইতিহাসে কলকাতা নাইট রাইডার্স এবং শাহরুখ খানের নাম আজ সমার্থক। কেকেআর-এর বেগুনি-সোনালী জার্সিতে ইডেন গার্ডেন্সে শাহরুখের উপস্থিতি মানেই গ্যালারিতে উন্মাদনার সুনামি। কিন্তু আপনি কি জানেন, আজ যে শাহরুখ কেকেআর-এর সাফল্যের প্রধান কাণ্ডারি, আইপিএলের শুরুতে তিনি নাকি দল কিনতেই চাননি! এমনকি ক্রিকেট খেলাটাই নাকি ঠিকঠাক বুঝতেন না ‘বাদশা’।
সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইপিএলের প্রতিষ্ঠাতা তথা প্রাক্তন চেয়ারম্যান ললিত মোদি এক বিস্ফোরক ও চমকপ্রদ তথ্য ফাঁস করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, কীভাবে শাহরুখকে বুঝিয়ে আইপিএলে আনা হয়েছিল এবং কীভাবে প্রায় ‘বিনামূল্যে’ কেকেআর-এর মালিক হয়ে গিয়েছিলেন ‘কিং খান’!
ললিত মোদি জানান, আইপিএল শুরু হওয়ার প্রায় এক বছর আগে, তিনি যখন বিসিসিআই-এর সহ-সভাপতি, তখন জয়পুরে হওয়া প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে শাহরুখ খানকে অতিথি হিসেবে নিয়ে গিয়েছিলেন। মোদীর কথায়, “যখন শাহরুখ স্টেডিয়ামে এল, আমি দেখলাম সব দর্শক আক্ষরিক অর্থেই উন্মাদ হয়ে গেল। ও-ই হয়ে উঠল ম্যাচের মূল আকর্ষণ। তখনই আমি বুঝেছিলাম, ভারতে দুটো জিনিস সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়— ক্রিকেট আর বলিউড। টেলিভিশনের প্রাইম টাইম অর্থাৎ রাত ৮টার স্লটে ‘শাশুড়ি-বউমার’ মেগা সিরিয়ালগুলোর সাথে টক্কর দিতে গেলে ক্রিকেটের সঙ্গে গ্ল্যামার মেশানোটা বড্ড দরকার ছিল। এটা একটা মস্ত বড় ঝুঁকি ছিল।”
এই স্ট্র্যাটেজি বা পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ললিত মোদি ফ্র্যাঞ্চাইজি কেনার জন্য শাহরুখ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু শাহরুখের প্রতিক্রিয়া মোদিকে অবাক করে দিয়েছিল। ললিত মোদি খোলসা করেন, “মজার বিষয় হল, শাহরুখ তখন ক্রিকেট একদম পছন্দ করত না, আর বুঝতও না। ও আসলে ফুটবলপ্রেমী। আমি যখন ওকে আইপিএল-এর ক্রিকেট দল কিনতে বললাম, ও বেশ ভয় পেয়ে গেল। বলল— ‘আমি তো ক্রিকেট বুঝি না ভাই।’ আমি ওকে আশ্বস্ত করে বললাম, ওটা আমার ওপর ছেড়ে দাও, ব্যাকএন্ডে ঠিকঠাক টিম আর সিস্টেম আমি তৈরি করে দেব।”
ক্রিকেটের জুজু কাটলেও শাহরুখের দ্বিতীয় চিন্তা ছিল আর্থিক ক্ষতি। তিনি মোদীকে জিজ্ঞেস করেন, যদি নিলামে তিনি দল জেতেন, তবে ওঁর কত টাকা খরচ হতে পারে? মোদী জানান, ডাউন পেমেন্ট বা প্রথম কিস্তি বাবদ ২০ কোটি টাকা দিতে হবে। তা শুনে চমকে উঠে শাহরুখ বলেছিলেন— “কিন্তু ওটা তো আমার সেভিংস অ্যাকাউন্টের একটা মস্ত বড় অংশ (জীবনের সঞ্চয়)!”
শাহরুখের এই আর্থিক দুশ্চিন্তা দূর করতে ললিত মোদি এক মাস্টারপ্ল্যান ফাঁদেন। সেই সময় মোবাইল প্রস্তুতকারক জায়ান্ট ‘নকিয়া’ শাহরুখ খান-কে তাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করার জন্য মরিয়া ছিল। মোদী নকিয়ার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে চান, শাহরুখ যদি আইপিএলে দল কেনেন, তবে তাঁরা দলটির জার্সির সামনের বংশের প্রধান স্পনসর হতে রাজি আছেন কি না। নকিয়া এক কথায় রাজি হয়ে যায়।
ললিত মোদী সেই রোমাঞ্চকর মুহূর্তের স্মৃতি চারণ করে বলেন, “এটা নকিয়া এবং শাহরুখ— দুজনের জন্যই উইন-উইন পরিস্থিতি ছিল। শাহরুখ আক্ষরিক অর্থেই বিনামূল্যে কেকেআর দলটা কিনে ফেলেছিল। পুরো চুক্তিটি হয়েছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। দুপুর ১২টার সময় শাহরুখ দল কেনার জন্য ২০ কোটি টাকার চেকে সই করেন, আর ওইদিন বিকেলের মধ্যেই নকিয়া কেকেআর-কে স্পনসর করার জন্য সমপরিমাণ অর্থের আরেকটি চেক লিখে দেয়। শাহরুখের টাকা নকিয়া ব্যাকআপ করে দিয়েছিল।”
বাকিটা তো ইতিহাস! শাহরুখ খান, জুহি চাওলা এবং জয় মেহতার যৌথ মালিকানাধীন কলকাতা নাইট রাইডার্স আজ আইপিএলের অন্যতম সফল এবং সবচেয়ে মূল্যবান ফ্র্যাঞ্চাইজি। একাধিক ট্রফি জয় এবং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের ভালবাসা প্রমাণ করে, ললিত মোদির সেই ২০ কোটি টাকার বুদ্ধি আজ শাহরুখের জীবনের অন্যতম সেরা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত ছিল।















