নয়ের দশকের শুরুতে দূরদর্শনের পর্দায় ‘খানা খাজানা’ দিয়ে ভারতের ঘরে ঘরে রান্নার শো-কে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন শেফ সঞ্জীব কাপুর। ভারতে ফুড টেলিভিশনের পথপ্রদর্শক বলা হয় তাঁকে। আর সেই সঞ্জীব কাপুরকেই যখন ২০১০ সালে স্টার প্লাসের মেগা শো ‘মাস্টারশেফ ইন্ডিয়া’ -র প্রথম সিজনের জন্য বিচারক হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়, তিনি তা মুখের ওপর ফিরিয়ে দিয়েছিলেন! সম্প্রতি দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে সেই বিস্ফোরক সিদ্ধান্তের পেছনের আসল কারণ এবং ওঁর রাখা সেই ঐতিহাসিক ‘১ টাকার শর্ত’ নিয়ে খোদ খোলসা করলেন কিংবদন্তি শেফ।

২০১০ সালে যখন ‘মাস্টারশেফ ইন্ডিয়া’ ওঁর প্রথম সিজন নিয়ে বাজারে আসে, তখন বলিউডের ‘খিলাড়ি’ অক্ষয় কুমার -কে শো-এর মূল আকর্ষণ হিসেবে আনা হয়েছিল। ওঁর পাশাপাশি বিচারক হিসেবে থাকার জন্য যোগাযোগ করা হয় সঞ্জীব কাপুরের সঙ্গে। কিন্তু সঞ্জীব কাপুর সাফ জানিয়ে দেন, ওঁর একটি শর্ত আছে। শর্তটি কী ছিল?সঞ্জীব কাপুর বলেন, “যখন ওরা প্রথমবার আমার কাছে আসে, আমি বলেছিলাম— ‘খুব ভাল কথা, আমি শো-টি করতে পেরে খুশি হব। তবে আমার একটাই শর্ত। অক্ষয় কুমারকে আপনারা যা পারিশ্রমিক দিচ্ছেন, আমি ওঁর থেকে ঠিক ১ টাকা বেশি নেব!’ কারণ এটা আমার সাম্রাজ্য, আমার ফিল্ড। এখানে যদি আমি নিজের দাম না আদায় করতে পারি, তবে আর লাভ কী?”

কিন্তু প্রথম সিজনে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ ওঁর এই শর্তে রাজি হননি। নিজের আত্মসম্মান ও ব্র্যান্ড ভ্যালু নিয়ে বিন্দুমাত্র আপস করতে চাননি সঞ্জীব কাপুর। ফলে তিনি শো-টি প্রত্যাখ্যান করেন। এমনকী নির্মাতারা বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও স্রেফ একটি পর্বেও অতিথি হিসেবে আসতে রাজি হননি তিনি।

 

অক্ষয় কুমার, শেফ কুনাল কাপুর এবং শেফ অজয় চোপড়াকে নিয়ে প্রথম দুটি সিজন চললেও শো-টি দর্শকদের মনে জায়গা করে নিতে চরম ব্যর্থ হয়। টিআরপি তলানিতে ঠেকলে বাধ্য হয়ে তৃতীয় সিজনের আগে নির্মাতারা আবার সঞ্জীব কাপুরের দরজায় কড়া নাড়েন।

সঞ্জীব কাপুর সেই দিনটির কথা মনে করে জানান, “তৃতীয় সিজনের সময় ওরা এসে আক্ষরিক অর্থেই বলেছিল— ‘স্যার, শো-টি একদম চলছে না। আমাদের আপনাকে ভীষণভাবে প্রয়োজন। আমাদের এখন কী করা উচিত বলুন?’ আমি কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম, কিন্তু ওরা বলল— ‘স্যার, আপনি যা বলবেন, আমরা ঠিক সেটাই করব’।” শেষমেশ ২০১৩ সালে নিজের শর্তেই, অর্থাৎ অক্ষয় কুমারের সেই পুরোনো পারিশ্রমিককে টেক্কা দিয়েই শো-টিতে যোগ দেন সঞ্জীব কাপুর।সাক্ষাৎকারে সঞ্জীব কাপুর স্পষ্ট করেন যে, ওঁর এই জেদ কেবল ওঁর একার জন্য ছিল না। ওঁর লক্ষ্য ছিল ভারতের রান্নার জগত বা ‘ফুড এন্টারটেইনমেন্ট’-কে একটা সম্মানজনক জায়গায় নিয়ে যাওয়া।” 

সঞ্জীব কাপুরের কথায়, “সেই সময় আমি ‘ফুড ফুড’ টিভি চ্যানেল চালাচ্ছিলাম এবং অন্য শেফদেরও জনপ্রিয় করার চেষ্টা করছিলাম। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, ‘মাস্টারশেফ’-এর মতো একটা আন্তর্জাতিক ফরম্যাট যদি ভারতে ফ্লপ হয়ে যায়, তবে এ দেশে ফুড এন্টারটেইনমেন্টের ব্যবসা চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। তাই ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচাতে এবং নিজের শর্ত পূরণ হওয়াতেই আমি শো-টি বাঁচাতে এগিয়ে আসি।” কয়েকটি সিজন দাপটের সঙ্গে বিচার করার পর অবশ্য সময়ের অভাব এবং খাটুনির তুলনায় রিটার্ন কম মেলায় শো থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ান তিনি। তবে ওঁর হাত ধরেই যে এ দেশে মাস্টারশেফের ভিত মজবুত হয়েছিল, তা আজ ওপেন সিক্রেট।