শুরু হয়েছে মাধ্যমিক পরীক্ষা। সোমবার ছিল মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রথম দিন। জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা দেওয়া শুরু করেছে চলতি বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরা। যতই আশ্বাস দেওয়া হোক না কেন, স্বভাবতই এই পরীক্ষা ঘিরে ভয়, উত্তেজনা, আশঙ্কা এসে হাত ধরাধরি করে জড়ো হয় অধিকাংশ পরীক্ষার্থীদের মনে। আচ্ছা, তারকারা যখন যখন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিলেন তখন কেমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাঁদের? ভয়-আশঙ্কা কি তাঁদেরও হতো? পরীক্ষার সময় বন্ধুদের থেকে কি টুকটাক সাহায্য-ও পেতেন? স্মৃতির পুকুরে ডুব মেরে নিজেদের সেই সব গল্প শোনালেন বিখ্যাত অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত, সৃজলা গুহ, অর্পণ ঘোষাল এবং ঋষভ বসু। সেই পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে নিজেদের মতো জানালেন শুভেচ্ছাবার্তাও।
জীবনের অধিকাংশ সময়টা মঞ্চে কাটানোর পর বড়পর্দা, ধারাবাহিকে ও ওয়েব সিরিজে চুটিয়ে কাজ করছেন সোহিনী সেনগুপ্ত । সঙ্গে নান্দীকার-এর দায়িত্ব পালন তো আছেই। আজকাল ডট ইন-এর সঙ্গে নিজের মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার প্রসঙ্গ উঠতেই হেসে ফেললেন তিনি। এরপর স্মৃতি ঘেঁটে অভিনেত্রী বললেন, “অ্যাসিম্বলি অফ গড চার্চ স্কুলে পড়াশোনা করেছি। আমি বরাবর-ই পরীক্ষা দেওয়ার সময় ভীষণ কনফিডেন্ট থাকতাম যে প্রচুর নম্বর পাব এবং যথারীতি পেতাম না। পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে এসে বলতাম, দুরন্ত নম্বর পাব। এরপর দেখতাম অঙ্কে ফেল করেছি। মানে, আমি কিন্তু আজও ভাগ করতে পারব না। তখন বাবা-মা কিছু জিজ্ঞেস করলে আমার জবাব থাকত, ‘আমি তো সলিউশন মিলিয়ে দিয়েছিলাম সেটা শিক্ষকের জবাবের সঙ্গে না মিললে আমি কী করব?' বলতে বলতে হেসে ফেললেন তিনি ,খানিক থেমে সোহিনী আরও বলে উঠলেন, "যদিও মাধ্যমিকে আমি কিন্তু অঙ্কে পাশ করেছিলাম। গা ঘেঁষে একটুর জন্য পাশ করে গিয়েছিলাম, কিন্তু করেছিলাম। সেটা আমার কাছে বিরাট অ্যাচিভমেন্ট ছিল। সেই সময় আমার অঙ্কের শিক্ষক বলেছিলেন,'এটা অসম্ভব ব্যাপার একটা। কী করে হল! এক্ষুনি ওর অঙ্কের খাতা রিভিউ করতে দেওয়া উচিত!' এর পাশাপাশি সোহিনী আরও জানান, তাঁর বাবা-মা কখনওই পড়াশোনার বিষয়ে চাপ দেননি। এমনকী, প্রাইভেট টিউটর-ও ছিল না। কেন? ‘ফুলপিসি ও এডওয়ার্ড' ছবির মুখ্য অভিনেত্রীর কথায়, " আমাদের পরিবারের টাকাপয়সার সেই স্বাচ্ছল্য ছিল না। যদিও আমার ইংরেজি পড়তে খুব ভাল লাগত, ছোটবেলা থেকেই। আনন্দ করেই পড়তাম। তাই মাধ্যমিকে নিয়ে কোনও আতঙ্ক না থাকলেও, স্নাতকোত্তর পর্যায় পড়াশোনা নিয়ে একটু ভয় পেয়েছিলাম। কারণ সেই সময়টা আমি পুরোপুরি থিয়েটারে মনোনিবেশ করে ফেলেছিলাম। ”
ছোটপর্দায়, ওয়েব সিরিজে সৃজলা গুহ অত্যন্ত পরিচিত নাম। এর পাশাপাশি ভাল বেলি ড্যান্সার। তিনি যেমন নিজের মতো করে কাজ বেছে করেন, তেমন স্পষ্টভাবে গুছিয়েও কথা বলেন। মাধ্যমিক পরীক্ষার অভিজ্ঞতা নিয়ে সৃজলা স্পষ্ট করে বললেন, “আমি দিল্লি পাবলিক স্কুলে পড়াশোনা করেছি। বরাবর-ই পড়াশোনা করতে ভালবাসতাম। রেজাল্টও বেশ ভাল হতো। ফলে মাধ্যমিকে একটা চাপ তৈরি হয়েছিল নিজের উপর। যতই পড়াশোনা করি, রাত জাগি কিছুতেই সেই চাপ যায়নি পরীক্ষা শুরুর আগে পর্যন্ত। যদিও মাধ্যমিকের আগে সাধারণত রাত জেগেই পড়াশোনা করতাম। আর একটা কথা, আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই মাধ্যমিক পরীক্ষা কিন্তু জীবনে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, সে আপনি যে পেশাতেই থাকুন না কেন। ফিরে তাকালে বুঝি, আমাদের সময় আর এখনকার সময়ে মাধ্যমিক পরীক্ষার পাঠ্যক্রমে বিস্তর তফাৎ। এখন ছাত্র-ছাত্রীরা মাধ্যমিককে বেশ খানিকটা হালকা ভাবেই নিচ্ছে, এতটা ক্যাজুয়াল হওয়াটা ঠিক নয় বোধ হয়।” কথাশেষে তাঁর সংযোজন, “মাধ্যমিকে পরীক্ষার সময়ে বন্ধুদের কিন্তু যথেষ্ট সাহায্য করেছিলাম আমি, যেহেতু সারা বছর পড়তাম...আর এই যে বন্ধুদের মাধ্যমিক পরীক্ষার হল ঘরে বসে সাহায্য করেছিলাম তাতে যদি কেউ আমার থেকে কয়েক নম্বর বেশি পেয়েও থাকে, তা নিয়ে আজও এতটুকু আফসোস নেই। এটা আমার পারিবারিক শিক্ষা। বরং মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার স্মৃতিগুলো মনে পড়লে আজও মজা লাগে। তাই পরীক্ষার্থীদের বলব, ঘাবড়িও না। অহেতুক দুশ্চিন্তা করো না। জমিয়ে পরীক্ষা দাও।”
কখনও তিনি মঞ্চাভিনেতা, আবার কখনও তিনি বড়পর্দায় জনপ্রিয় ‘গোয়েন্দা’। আবার তিনি-ই ফাইন আর্টিস্ট। তিনি, ঋষভ বসু। যথেষ্ট কৃতী ছিলেন ছাত্র হিসেবেও। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাক্তনী নিজের মাধ্যমিক পরীক্ষার আপাত মজাদার কিন্তু ভয়ঙ্কর স্মৃতি ভাগ করে নিলেন আজকাল ডট ইন-এর সঙ্গে – “ছোটবেলা কেটেছে কাঁকুড়গাছিতে। চুটিয়ে ফুটবল খেলতাম পাড়ার মাঠে। মাধ্যমিকেও আগেও সেই খেলায় ফুলস্টপ দিইনি। মাধ্যমিক পরীক্ষার ঠিক এক সপ্তাহ আগে খেলতে গিয়ে ঠোঁট ফেটে রক্তারক্তি! সাতটা সেলাই পড়েছিল ঠোঁটে! ভাল-ই হয়েছিল একদিকে যে বাকি কয়েকটা দিন মুখ বুজে পড়াশোনা করতে পেরেছিলাম। আর বাবা-মায়েরও সুবিধে হয়েছি, কারণ এক তরফা ঝেড়েছিল আমাকে...” হাসতে হাসতে বলে ওঠেন অভিনেতা। এখানেই থামেননি ঋষভ। আরও বলেন, “অদ্ভুতভাবে মাধ্যমিকের রাতগুলো যখন জেগে পড়তাম, চোখভর্তি করে ঘুমের দল এসে হাজির হতো। ব্যাপারে বাপ্ কী কষ্ট যে হতো। তখন চোখ ডলে ডলে পড়তাম আর ভাবতাম একবার পরীক্ষাটা শেষ হোক, প্রাণ ভরে ঘুমোব। কী আশ্চর্য! তখন কিন্তু আর ঘুম আসতো না। খুব মনে পড়ে, পরীক্ষার সময় হল-কালেকশননের ব্যাপারটা। প্রশ্নে আটকে গেলে বন্ধুদের থেকে জবাব পেতাম, নিজেও খাতা দেখিয়েছি উপুড় করে! উফফ সেই সময়টা যে কী মজার ছিল। আর একটা কথা এখনকার মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের বলতে চাই। জীবন অনেক বড়, অনেক সুন্দর মাধ্যমিক পরীক্ষার রিপোর্ট কার্ড একমাত্র জায়গা নয় যে নিজেকে সেখানেই শুধু প্রমাণ করতে পারবে। জীবনের ময়দানে এখন দাঁড়িয়ে মনে হয়, খুব একটা গুরুত্ব নেই এই পড়িয়খার। বরং এই বয়সটায় প্রাণ ভরে বাঁচো, বন্ধুদের সঙ্গে থাকো। খেলাধুলো করো। চাপ নিও না!”
বড়পর্দা এবং ছোটপর্দার মধ্যে তাঁর অনায়াস আনাগোনা। এবং তাঁর ফাঁকফোকরে মঞ্চেও। সম্প্রতি বড়পর্দায় জনপ্রিয় কমিকস চরিত্র ‘রাপ্পা রায়’কে জীবন্ত করেছেন অর্পণ ঘোষাল । তাঁর মাধ্যমিকের অভিজ্ঞতা কিন্তু এককথায় দুরন্ত। অর্পণের কথায়, “হিন্দু স্কুলের ছাত্র ছিলাম। শুনুন, মাধ্যমিক নিয়ে কোনও টেনশন ছিল না আমার। সত্যি বলছি। আরে, পড়াশোনা করলে তো টেনশনটা থাকবে। বাড়ির লোকেরাও কোনওদিন চাপ দেইনি। একা একাই মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম বাসে চেপে। তারপর শুরু হয় মজা। যে স্কুলে সিট পড়েছিল সেখানে বাকি বন্ধুদের মুখের অভিব্যক্তি, মা-বাবাদের ছটফটানি দেখে বুঝেছিলাম ব্যাপারটা সিরিয়াস। তাই আমিও মুখেচোখে যথাসম্ভব একটা গম্ভীর ব্যাপার ফুটিয়ে তুলেছিলাম। মানে লোক-দেখানো আর কী...” হাসতে হাসতে বললেন অর্পণ।
আরও জানান, নাটক, অভিনয় ছাড়া অন্য কোনও বিষয়ে পড়াশোনাটা করা নিয়ে তিনি সিরিয়াস ছিলেন না কোনওদিন। ওই পড়তে হয় বলেই পড়তেন। মাধ্যমিকের আগে পণ করেছিলেন রাত জেগে পড়ে সবাইকে চমকে দেবেন। কিন্তু নিজেই সেই কথা রাখতে পারেননি। অভিনেতার কথায়, " মা এসে মাঝরাতে ডেকে তুলে দিলে বুঝতাম, পড়তে পড়তে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি। এটা নিত্যদিনের ব্যাপার ছিল।" কথা শেষ করলেন অদ্ভুত একটা অভিজ্ঞতা দিয়ে – “মাধ্যমিকের সেটা শেষদিনের পরীক্ষা ছিল। কোন বিষয় ভুলে গিয়েছি। পরীক্ষা শেষে বাথরুমে গিয়েছি, ওম্মা গিয়ে দেখি আমার এক সহপাঠী রেগেমেগে বাথরুমের গোল মতো দেখতে বাল্বটা খুলে নিচ্ছে! কারণ জিজ্ঞেস করতেই জবাব দিয়েছিল, ‘ধুর, এত বাজে, কড়া গার্ড দিয়েছে এই স্কুলের স্যারগুলো তাই আমিও এই স্কুলের একটা জিনিস বাড়িতে নিয়ে যাব! এটাই আমার প্রতিশোধ...’” ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে অর্পণের হাসি ছড়িয়ে পড়েছে আশেপাশে।
