ভারতের সঙ্গীত আকাশ থেকে খসে পড়ল উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। ৯২ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোঁসলে। মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে একটি যুগের অবসান হল। চিকিৎসক ড. প্রতীত সামদানি এই প্রবীণ শিল্পীর প্রয়াণের খবর নিশ্চিত করেছেন।শনিবার, ১১ এপ্রিল দুপুরের দিকে হঠাৎই হৃদরোগে আক্রান্ত হন বর্ষীয়ান এই গায়িকা। তড়িঘড়ি তাঁকে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে আইসিইউ-তে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। অভিজ্ঞ কার্ডিওলজিস্টদের একটি বিশেষজ্ঞ দল আপ্রাণ চেষ্টা চালালেও শেষরক্ষা হলো না। ১২ এপ্রিল সকালে সুরের মায়া কাটিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ‘আশা তাই’।লতা মঙ্গেশকর, কিশোর কুমার, মহম্মদ রফি এবং মুকেশ—যে কণ্ঠস্বরগুলো গত অর্ধশতাব্দী ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করেছে, তাঁদের মধ্যে শেষ প্রতিনিধি হিসেবে প্রদীপের আলো ধরে রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু রবিবার সকালে মুম্বইয়ের আকাশে শোকের মেঘ ঘনিয়ে এল। চিরনিদ্রায় আচ্ছন্ন হলেন ‘আশা তাই’। আর তাঁর চলে যাওয়ার সঙ্গেই ভারতীয় সংগীতের সেই অবিস্মরণীয় ‘গোল্ডেন এরা’ বা স্বর্ণযুগের ওপর চিরতরে পর্দা নেমে এল।
আশা ভোঁসলের প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা দেশে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বলিউডের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। শিল্পীর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ জানিয়ে এক্স হ্যান্ডে পোস্ট করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করে এক্স হ্যান্ডেলে মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, “আশা ভোঁসলের প্রয়াণে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। তিনি যতটা অনুপ্রেরণাদায়ক ততটাই একজন উঁচুমানের গায়িকা ছিলেন।প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমাদের হৃদয়ে রাজত্ব করেছেন।” মুখ্যমন্ত্রী আরও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বাংলার সঙ্গে আশার নিবিড় সম্পর্কের কথা। তিনি লেখেন, “তিনি অনেক বাংলা গান গেয়েছেন এবং বাংলায় অবিশ্বাস্যভাবে জনপ্রিয়। ২০১৮ সালে আমরা তাঁকে আমাদের রাজ্যের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘বঙ্গবিভূষণ’ প্রদান করতে পেরেছিলাম। তাঁর পরিবার, অনুরাগী এবং বিশ্বের কোটি কোটি ভক্তের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা।”

উল্লেখ্য, আগামীকাল বিকেল ৪টেয় শিবাজী পার্কে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে বলে খবর।
এক্স -এ একটি আবেগঘন বার্তার মাধ্যমে 'আশা তাই'-এর বর্ণময় কেরিয়ার এবং ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে তাঁর অমূল্য অবদানের কথা স্মরণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, "আশা ভোঁসলেজির প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। ভারত আজ পর্যন্ত যত কালজয়ী এবং বহুমুখী কণ্ঠস্বর শুনেছে, তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম সেরা। কয়েক দশক ব্যাপী তাঁর অসাধারণ সঙ্গীত সফর আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে এবং বিশ্বের অগণিত মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে।" আশা ভোঁসলের গানের বৈচিত্র্যের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী আরও যোগ করেন, "তাঁর কণ্ঠের মায়াবী সুর হোক বা প্রাণবন্ত সুরারোপ, সবকিছুর মধ্যেই ছিল এক চিরন্তন উজ্জ্বলতা। তাঁর সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো আমার কাছে সবসময় অমলিন থাকবে।" শোকসন্তপ্ত পরিবার এবং অনুরাগী সমাজকে সমবেদনা জানিয়ে তিনি লেখেন, "আগামী প্রজন্মের কাছেও তিনি অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন এবং তাঁর গান মানুষের জীবনে চিরকাল প্রতিধ্বনিত হবে।"
Deeply saddened by the passing of Asha Bhosle Ji, one of the most iconic and versatile voices India has ever known. Her extraordinary musical journey, spanning decades, enriched our cultural heritage and touched countless hearts across the world. Be it her soulful melodies or… pic.twitter.com/SbFrzf1Meu
— Narendra Modi (@narendramodi)Tweet by @narendramodi
১৯৪৩ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সে দিদি লতা মঙ্গেশকরের হাত ধরে কেরিয়ার শুরু করেছিলেন আশা। পাঁচের দশকে যখন তাঁর লতা দিদি একের পর এক সুপারহিট গানে রাজত্ব করছেন, তখন আশাকে লড়তে হয়েছে ‘লতার বোন’ পরিচয়ের সঙ্গে। সেই সময়ে মূলত ডান্স নাম্বার বা ক্যাবারে গানের জন্য তাঁকে সীমিত রাখা হয়েছিল। কিন্তু দমে যাননি তিনি। হেলেনের লিপে ‘পিয়া তু আব তো আ যা’ কিংবা ‘দম মারো দম’ এই গানগুলোর মাধ্যমেই তিনি নিজের এক অনন্য স্বাক্ষর তৈরি করেন।আশির দশক পর্যন্ত অনেকেই মনে করতেন আশা কেবল চটুল গানেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু ১৯৮১ সালে ‘উমরাও জান’-এর গজল গেয়ে তিনি সেই ভুল ভেঙে দেন। লতা মঙ্গেশকরের সমতুল্য গাম্ভীর্য আর মাধুর্য নিয়ে তিনি জয় করেন জাতীয় পুরস্কার। এরপর ‘ইজাজত’ ছবির ‘মেরা কুছ সামান’ বুঝিয়ে দিয়েছিল, আবেগের গভীরতায় তিনি অনন্য। ‘লতার বোন’ পরিচয় ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী আশা ভোঁসলে।
আশার জীবন ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে নিজের দ্বিগুণ বয়সী গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করে ঘর ছেড়েছিলেন। ১৯৬০ সালে সেই সম্পর্ক ভেঙে দুই সন্তানকে নিয়ে মায়ের কাছে ফিরে এলেও ‘ভোঁসলে’ পদবি তিনি কখনও ত্যাগ করেননি। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে বয়সে ছোট আর.ডি. বর্মনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আরও একবার সমাজের প্রচলিত নিয়ম ভেঙেছিলেন।
আজ সেই বিদ্রোহী আর সুরেলা কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল। রেখে গেল হাজার হাজার কালজয়ী গান আর এক অনন্য জীবনগাথা।
হিন্দি, বাংলা, মারাঠি, গুজরাতি সহ একাধিক ভাষায় হাজার হাজার গান গেয়েছেন আশা। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত থেকে শুরু করে পপ, গজল বা লোকসঙ্গীত—প্রতিটি ঘরানায় তাঁর দখল ছিল প্রশ্নাতীত। বিশেষ করে সঙ্গীত পরিচালক আর.ডি. বর্মনের সঙ্গে তাঁর কালজয়ী জুটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। বাংলা আধুনিক গান এবং সিনেমার গানেও তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।
















