পরিচালক অনীক দত্ত-র রহস্যজনক মৃত্যুর পর টলিপাড়ার প্রতিটা কোণ থেকে উঠে আসছে ওঁর সঙ্গে কাটানো টুকরো টুকরো স্মৃতির কোলাজ। ১৯৯৯ বা ২০০০ সালের এক আনকোরা নতুন অভিনেতা ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়েরর সঙ্গে অনীক দত্তর প্রথম আলাপের গল্পটি ঠিক তেমনই এক নস্টালজিক দলিল। জীবনের প্রথম বিজ্ঞাপনের শুটিং, অফিসের কাজ ফাঁকি দিয়ে স্টুডিওতে পৌঁছানো এবং অনীক দত্তর নিখুঁত ও চটজলদি কাজের টেকনিক শেখার সেই অমূল্য অভিজ্ঞতা আজ বড্ড বেশি মনে পড়ছে টলিপাড়ার এই জনপ্রিয় অভিনেতার।

তখন ভাস্বর চট্টোপাধ্যায় অভিনেতা হিসেবে এক্কেবারে নতুন। ১৯৯৯ বা ২০০০ সাল নাগাদ ‘আনমোল বিস্কুট’ -এর একটি বিজ্ঞাপনের জন্য তাঁকে নির্বাচন করেন অনীক দত্ত। উল্টোদিকে নায়িকা হিসেবে ছিলেন টলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়। ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে সেই শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা মনে করে ভাস্বর সমাজমাধ্যমে লিখলেন নাতিদীর্ঘ একটি পোস্ট।  

 

অভিনেতা লিখলেন, “আমি অফিস ফাঁকি মেরে শুটিংয়ে পৌঁছালাম। জীবনের প্রথম বিজ্ঞাপনের শুটিং, তাই মারাত্মক টেনশনে ছিলাম। ফ্লোরে ডাক পড়তে পড়তে প্রায় বিকেল হয়ে গেল। অনীকদা এসে খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন কী করতে হবে। আমি শট দিলাম, কিন্তু হল না। কয়েকটা এনজি বা রিটেকের পর অনীকদা আমাকে বিজ্ঞাপনের মূল মন্ত্রটা শেখালেন। উনি বললেন— ‘বিজ্ঞাপনের কাজে সবটাই চটজলদি করতে হয়। বিস্কুটে কামড় দিয়েই এক্সপ্রেশন বা মুখের অভিব্যক্তি চেঞ্জ করতে হবে।’ বার পাঁচেকের চেষ্টায় শটটা ওকে হল, আর সেই সঙ্গে অনীকদার হাত ধরে আমি অভিনয়ের একটা নতুন টেকনিকও শিখে নিলাম।”

 

 

অনীক দত্তর পরিচালনায় এর পরের কাজ ছিল বলিউড ও টলিউড খ্যাত অভিনেত্রী রিমি সেন-এর সঙ্গে, ‘সানরাইজ’ গুঁড়ো মশলার বিজ্ঞাপনে। সেই বিজ্ঞাপনে ওই অভিনেতার মুখে একটা ক্যাচলাইন ছিল— “আমার তো সেই নর্থে বাড়ি”। বিজ্ঞাপনটি সেই সময় এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, বাস্তব জীবনেও সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে অভিনেতার বাড়ি বুঝি সত্যিই উত্তর কলকাতায়! বিজ্ঞাপনের মাত্র কয়েক সেকেন্ডে দর্শকের মনে চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলার এই জাদুকরী ক্ষমতা কেবল অনীক দত্তর পক্ষেই সম্ভব ছিল।

পরবর্তীতে ২০২০ সালে ‘সানরাইজ গুঁড়ো মশলা’র বিজ্ঞাপনে অনীক দত্তর সঙ্গে তৃতীয়বার কাজ করার সুযোগ পান তিনি। কিন্তু ততদিনে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ বা ‘অপরাজিত’র খামখেয়ালি, পারফেকশনিস্ট পরিচালকের ভেতরে কোথাও যেন বাসা বেঁধেছিল এক অদ্ভুত অস্থিরতা। অভিনেতা সেই দিনের কথা স্মরণ করে বলেন, “২০২০-তে কাজ করতে গিয়ে দেখলাম অনীকদা খুব অস্থির। খুব সাধারণ ছোটখাটো ব্যাপার নিয়েও সেট-এ এত প্যানিক করছেন যে বাকিরা সবাই ভয়ে অস্থির হয়ে যাচ্ছিল। আমি আমার কাজটুকু করে চলে এসেছিলাম, সেদিন সারাদিনে ওঁর সঙ্গে খুব একটা বিশেষ কথা হয়নি। কিন্তু দূর থেকে আমি ওঁকে লক্ষ্য করছিলাম। আমার বারবার মনে হচ্ছিল, ভেতরে ভেতরে উনি খুব অস্থির কিছু একটা নিয়ে লড়াই করছেন।”


এরপর এই পরিচালকের সঙ্গে ভাস্বরের শেষ দেখা হয়েছিল কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা তরুণ মজুমদারের স্মরণসভায়। তখনও কেউ জানত না যে, আর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই অনীক দত্ত নিজেই একটা স্মৃতিতে পরিণত হবেন।

অনীক দত্তর মেধার পাশাপাশি ওঁর অমায়িক ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে অভিনেতা আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, “যতবারই ওঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, উনি আমার সাথে ভীষণ ভাল ব্যবহার করেছেন। এমনকী আমি যখন ‘ভগৎ সিং’-এর চরিত্রে অভিনয়ের অফার পাই, অনীকদা নিজে ফোন করে আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন।”

কাজের প্রতি তীব্র সততা আর তীব্র পারফেকশনিজমের চাপই কি গ্রাস করেছিল বাংলা সিনেমার এই অনন্য প্রতিভাকে? আত্মহত্যা না কি দুর্ঘটনা— সেই আইনি ধোঁয়াশা হয়তো কেটে যাবে, কিন্তু বড় মাপের একজন পরিচালকের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক পরিণতি টলিপাড়ার প্রত্যেকটি মানুষের বুকেই এক গভীর ক্ষত রেখে গেল।