আজকাল ওয়েবডেস্ক: অনেক মানুষ এখনও বিশ্বাস করেন, রিয়েল-মানি গেমিং অ্যাপ ব্যবহার করে তারা সহজেই অতিরিক্ত আয়ের পথ খুঁজে পেতে পারেন। ঝকঝকে বিজ্ঞাপন, সাইন-আপ বোনাস এবং ‘জিতুন লাখ টাকা’ ধরনের বার্তাগুলো যেন আরও উৎসাহ দেয়। কিন্তু এই লোভনীয় আবরণীর আড়ালে লুকিয়ে আছে ক্ষতি, আসক্তি ও আর্থিক বিপর্যয়ের এক গভীর অন্ধকার।
এই বাস্তবতার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন সেবির বিনিয়োগ উপদেষ্টা এবং সাহজ মানির প্রতিষ্ঠাতা অভিষেক কুমার। তিনি লিংকডইনে বেশ কয়েকটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন, যা দেখায় কতটা মারাত্মকভাবে সাধারণ মানুষ এই অ্যাপগুলোর ফাঁদে আটকে যাচ্ছেন।


‘সহজ টাকা’ ভেবে ফাঁদে পড়া
অভিষেক কুমার উদাহরণ দেন এক ব্যবহারকারীর, যিনি মনে করেছিলেন রামি অ্যাপ ডাউনলোড করলে কিছু “সহজ টাকা” রোজগার করতে পারবেন। শুরুতে মেলে ছোট জয় — “কখনও ৫,০০০ টাকা, কখনও ১০,০০০ টাকা।” কিন্তু এই ক্ষুদ্র জয়ের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল বড় ফাঁদ। কিছুদিনের মধ্যেই সেই খেলোয়াড় বুঝতে পারেন তিনি এমন এক চক্রে ঢুকে পড়েছেন, যেখান থেকে বের হওয়া কঠিন।


অনেক ব্যবহারকারীর গল্প একই রকম। কেউ এক বছরে হারিয়েছেন ২ লাখ টাকা। একজন স্কুলশিক্ষক পর্যন্ত নিজের জমি বিক্রি করে দেন ক্ষতি পোষাতে। আরেক তরুণ, যার মাসিক আয় মাত্র ৫০,০০০ টাকা, সে ধার করে খেলতে থেকেছে, শুধু হারানো টাকা ফিরে পাওয়ার লোভে।


গেমিং কোম্পানির ভিতরের চালবাজি
কুমারের মতে, গেমিং কোম্পানির ভেতরের কর্মীরা জানিয়েছেন কীভাবে এই অ্যাপগুলো কাজ করে। যেসব ব্যবহারকারী বেশি টাকা খরচ করেন, তাদের বলা হয় “হোয়েলস”। এই হোয়েলদের প্রতিদিন ফোন করে আরও টাকা জমা দিতে উৎসাহ দেওয়ার জন্য বিশেষ টিম তৈরি থাকে।
সবকিছু এমনভাবে বানানো যে আপনার মস্তিষ্কের ডোপামিন রিসেপ্টরগুলোতে আঘাত করবে। আপনি ভাবেন আপনি সঠিক কার্ডটি বেছে নিয়েছেন। কিন্তু আসলে সিস্টেম শুরু থেকেই আপনার বিপক্ষে।


শুরুতে ইচ্ছাকৃতভাবে সহজ জয় দেখায় অ্যাপ। তারপর ধীরে ধীরে গেম কঠিন হয়ে যায়। বট ব্যবহার, ‘নিয়ার-মিস’ মুহূর্ত, লোভনীয় বোনাস—সবই খেলোয়াড়কে আটকে রাখার জন্য কৌশলগতভাবে তৈরি।


‘সাইড ইনকাম’—একটি বিপজ্জনক মিথ
অনেক ব্যবহারকারী মনে করেন, তারা আরেকটি রাউন্ড খেললেই সব ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু মানবমস্তিষ্ক ক্ষতি সহজে মেনে নিতে চায় না। তাই আবার খেলতে থাকে—“আর মাত্র একবার,” ভাবতে ভাবতে।


কুমার সতর্ক করে বলেন, “আপনার মস্তিষ্ক ক্ষতিকে সাময়িক ধাক্কা হিসেবে ব্যাখ্যা করে। এটাই ফাঁদ।” তিনি উল্লেখ করেন, ৪৫ কোটি ভারতীয় মিলে ২০,০০০ কোটি টাকারও বেশি হারিয়েছেন এইসব গেমিং অ্যাপের কারণে—যে টাকা তারা কখনও জিততেই পারতেন না।


কুমার তুলনা টানেন উচ্চ ঝুঁকির ডে-ট্রেডিংয়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, “স্টক মার্কেট অন্তত দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ তৈরি করে। গেমিং অ্যাপ কোনো মূল্যই তৈরি করে না। গত বছর ৯১% F&O ট্রেডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। গেমিংও ঠিক একই, শুধু এখানে শূন্য ভিত্তি।”


সম্প্রতি কিছু অ্যাপে নিষেধাজ্ঞা আরোপ হওয়ায় কিছু মানুষের জন্য এটি যেন স্বস্তি। তবে কুমার মনে করেন, “ব্যান যথেষ্ট নয়। সত্যিকারের পুনরুদ্ধারের জন্য কাউন্সেলিং, পরিবার ও আর্থিক সীমা অত্যন্ত জরুরি।”


অনেকে ইতিমধ্যেই গ্রে-মার্কেট অ্যাপ ও ভিপিএন ব্যবহার করে আবারও খেলা শুরু করছেন। তাই শুধু আইন নয়, প্রয়োজন মানুষের মানসিক ও আর্থিক সহায়তা।


শর্টকাট কখনও স্থায়ী সমাধান নয়
কুমার আরও বলেন, “টাকা রোজগার করা কঠিন। আর তা ধরে রাখা আরও কঠিন। শর্টকাট—গেমিং, বেটিং বা পরিকল্পনাহীন ট্রেডিং—সব একইভাবে শেষ হয়।” তিনি মনে করিয়ে দেন, আসক্তি দূর করতে তা অন্য কাজে লাগাতে হবে—ফিটনেস, দক্ষতা উন্নয়ন বা সহায়ক কমিউনিটির মতো ইতিবাচক পথে। আপনার টাকা পরিকল্পনা চায়—গেম নয়, কল্পনা নয়, আর কোনো শর্টকাটও নয়।