আজকাল ওয়েবডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গে, বিজেপি সরকার ২২ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য তাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ রাজ্য বাজেট পেশ করেছে। এতে সরকারি কর্মচারী, চাকরিপ্রার্থী, মহিলা, শিক্ষার্থী এবং গ্রামীণ কর্মীদের জন্য একগুচ্ছ বড় ঘোষণা করা হয়েছে।

বিধানসভায় বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক সংস্কার, পরিকাঠামো সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দিয়ে একে একটি "উন্নত বাংলা" গড়ার রূপরেখা হিসেবে অভিহিত করেন।

**মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) বৃদ্ধি**
এই বাজেটের সবচেয়ে বড় খবর হল, রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ  বৃদ্ধি। এতদিন পশ্চিমবঙ্গর সরকারের কর্মী ও পেনশনভোগীরা স১৮ শতাংশ হারে ডিএ পেতেন। যা বাজেটে আরও ২০ শতাংশ বাড়ার প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। যার ফলে মোট ডিএ-র হার দাঁড়িয়েছে ৩৮ শতাংশে। সংশোধিত এই হার ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।

একইভাবে 'ডিয়ারনেস রিলিফ' বা ডিআর বাড়িয়ে পেনশনভোগীদের জন্যও এই সুবিধা কার্যকর করা হবে। এই পদক্ষেপটি বিজেপির একটি বড় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করল। ভোটের আগে বিজেপি রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের ডিএ হারের মধ্যে ব্যবধান কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীরা বর্তমানে ৬০ শতাংশ হারে ডিএ পান। অর্থাৎ রাজ্যের ডিএ হার সংশোধনের পরও পার্থ্য রয়ে গেল ২২ শতাংশ।

**এক লক্ষ সরকারি চাকরি**
কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন দপ্তরে এক লক্ষ শূন্যপদে নিয়োগের ঘোষণা করেছে। নিয়োগের প্রধান পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে রয়েছে:

স্কুল শিক্ষা দপ্তরে ৫০,০০০ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী।
পুলিশ বাহিনীতে ২০,০০০ কর্মী।
রাজ্যের বিভিন্ন দপ্তরে আরও অতিরিক্ত নিয়োগ।

সরকার আরও ঘোষণা করেছে যে:

শূন্যপদের ৩৩ শতাংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
'অগ্নিপথ' প্রকল্পের আওতায় পরিষেবা সম্পন্ন করা 'অগ্নিবীর'-দের জন্য (যেখানে প্রযোজ্য) ১০ শতাংশ পর্যন্ত সংরক্ষণ থাকবে।
সরকারি চাকরির আবেদনকারীদের জন্য ঊর্ধ্বসীমার ক্ষেত্রে বিদ্যমান পাঁচ বছরের ছাড় আরও দুই বছর অব্যাহত থাকবে।

**ফ্রন্টলাইন ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের জন্য উন্নত বেতন**
বাজেটে বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। মাসিক সাম্মানিক বা ভাতার যে বৃদ্ধিগুলো ঘোষণা করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে:

অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী: ৫,০০০ টাকা।
আশা কর্মী: ৫,০০০ টাকা। 
পার্শ্ব-শিক্ষক: ৫,০০০ টাকা।
মিড-ডে মিলের রাঁধুনি: ১,০০০ টাকা।
সিভিক ভলান্টিয়ার: ২,০০০ টাকা।
হোম গার্ড: ২,০০০ টাকা।
গ্রিন পুলিশ কর্মী: ২,০০০ টাকা।
গ্রাম পুলিশ কর্মী: ২,০০০ টাকা।
ন্যাশনাল ভলান্টিয়ার ফোর্স কর্মী: ২,০০০ টাকা।
প্রাণী কল্যাণ কর্মীরা (যার মধ্যে প্রাণিবন্ধু, প্রাণিমিত্র ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্যরা অন্তর্ভুক্ত) মাসে অতিরিক্ত ২,০০০ টাকা পাবেন। 
ভিলেজ রিসোর্স পার্সন এবং ভেক্টর-নিয়ন্ত্রণ কর্মীরা প্রতিদিন অতিরিক্ত ১০০ টাকা পাবেন।

শিক্ষিত বেকারদের জন্য মাসিক ভাতা
বেকার যুবকদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে সরকার ‘ভরসা’ নামে একটি নতুন কল্যাণমূলক কর্মসূচি চালু করেছে। অক্টোবর মাস থেকে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকার যুবকরা মাসে ৩,০০০ টাকা এবং অন্যান্য যোগ্য বেকার যুবকরা মাসে ২,০০০ টাকা ভাতা পাবেন। ২১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ব্যক্তিরা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন, যদি তাঁদের পরিবারের বার্ষিক আয় এক লক্ষ টাকার কম হয় এবং তাঁরা অন্য কোনও সামাজিক কল্যাণ প্রকল্পের সুবিধা না পেয়ে থাকেন।

পরিকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ জোর
বাজেটে রাজ্যজুড়ে বেশ কয়েকটি বড় পরিকাঠামো প্রকল্পের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য ঘোষণাগুলোর মধ্যে রয়েছে:

পুরুলিয়া, মালদা ও বালুরঘাটে নতুন বিমানবন্দর।
শিলিগুড়ি, দুর্গাপুর ও আসানসোলের জন্য মেট্রো রেলের প্রস্তাব।
চিংড়িঘাটা থেকে নিউ টাউন পর্যন্ত ৯০০ কোটি টাকার এলিভেটেড করিডোর।
কালনা ও শান্তিপুরকে সংযোগকারী ১,২০০ কোটি টাকার সেতু।
ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের জন্য ১,২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ।
প্রশাসনিক ইউনিটের সম্প্রসারণ
সরকার পাঁচটি নতুন জেলা গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে: কলকাতা, বসিরহাট, সুন্দরবন, জঙ্গিপুর ও আরামবাগ। 
এছাড়া কাঁথিতে একটি নতুন পুলিশ জেলা, গোপীবল্লভপুরে একটি নতুন মহকুমা এবং রাজ্যজুড়ে বেশ কয়েকটি নতুন পৌরসভা গঠনের পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছে।

উচ্চশিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ
বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয়, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রধান প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে:

উত্তরবঙ্গে একটি আইআইটি।
উত্তরবঙ্গে একটি এইমস।
একটি নতুন ক্যান্সার হাসপাতাল।
আলিপুরদুয়ার ও কালিম্পংয়ে নতুন মেডিকেল কলেজ।
কাঁথি ও ফলতায় নতুন মহিলা কলেজ।
ঝাড়গ্রামে একটি আদিবাসী বিশ্ববিদ্যালয়।
অতিরিক্ত ৬৫০টি এমবিবিএস আসন এবং ৪৫০টি স্নাতকোত্তর মেডিকেল আসনের মাধ্যমে চিকিৎসা শিক্ষার বৃদ্ধি।

নারী ও শিক্ষার্থীদের সহায়তা
নারীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতে এবং স্কুলছুট হার কমাতে, সরকার সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজে ভর্তি হওয়া অবিবাহিত ছাত্রীদের জন্য ৫০,০০০ টাকা অনুদান ঘোষণা করেছে।

বাজেটে আরও যা চালু করা হয়েছে:

প্রতিটি জেলায় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য বিনামূল্যে কোচিং সেন্টার।
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য ৩০,০০০ টাকার এককালীন সহায়তা। মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে বাস ভ্রমণের সুবিধার্থে একটি প্রস্তাবিত ‘পিঙ্ক কার্ড’ প্রকল্প, যার জন্য ৫৫০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে।

সামাজিক কল্যাণমূলক পদক্ষেপ
সরকার প্রবীণ নাগরিক, বিধবা এবং বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের মাসিক ভাতা বৃদ্ধি করেছে। প্রতিটি শ্রেণীর প্রাপকরা মাসে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা করে পাবেন। এছাড়া, ‘অন্নপূর্ণা’ খাদ্য সুরক্ষা প্রকল্পের জন্য বাজেটে ৩৬,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

খেলাধুলা ও যুব উন্নয়ন
খেলাধুলার পরিকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি বড় উদ্যোগের কথা ঘোষণা করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:

উত্তরবঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম।
প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি করে মিনি ইনডোর স্টেডিয়াম।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ক্রীড়াবিদদের সহায়তা এবং পদকজয়ীদের পুরস্কৃত করার জন্য একটি বিশেষ তহবিল।

বাংলায় ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নীতি-বিবৃতি হিসেবে এই ২০২৬-২৭ সালের বাজেটটি গুরুত্বপূর্ণ। মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) বৃদ্ধি, ব্যাপক হারে নিয়োগ, কল্যাণমূলক প্রকল্পের সম্প্রসারণ, পরিকাঠামোয় ব্যয় এবং শিক্ষা সংক্রান্ত উদ্যোগের সমন্বয়ে প্রশাসন একদিকে যেমন সরকারি কর্মীদের ক্ষোভ ও বেকারত্বজনিত উদ্বেগের সমাধানের চেষ্টা করেছে, তেমনই রাজ্যের জন্য তাদের বৃহত্তর উন্নয়নের রূপরেখাও তুলে ধরেছে।

এখন সকলের নজর থাকবে এই ঘোষণাগুলির বাস্তবায়নের সময়সীমার ওপর। বিশেষ করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নিয়োগ প্রক্রিয়া, পরিকাঠামো প্রকল্প এবং সরকারি কর্মী ও কল্যাণ প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের জন্য বর্ধিত সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলির উপর।