আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভোটের আগে বাংলার রাজনীতিতে পরপর চমক। তার মধ্যে অবশ্যই অন্যতম, আচমকা রাজ্যপাল পরিবর্তন। সি ভি আনন্দ বোস। ভোটের মুখে আচমকা তাঁকে সরিয়ে নতুন রাজ্যপাল আনা হচ্ছে বাংলায়।  গত ৫ মার্চ দিল্লিতে গিয়ে আচমকা দিল্লিতে গিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন সি ভি আনন্দ বোস। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মর হাতে তাঁর পদত্যাগপত্র তুলে দিয়েছিলেন।  যদিও এতদিন পর্যন্ত, মাঝে মাঝেই রাজ্য সরকারের সঙ্গে বিরোধ দেখা দিয়েছে রাজ্যপালের, তবে বর্তমানে, অর্থাৎ একেবারে শেষ বেলায় পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। মঙ্গলবারেই রাজ্যপালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। বুধবার সামনে এল, বাংলার  মানুষের জন্য  রাজ্যপালের লেখা খোলা চিঠি। তাতে লিখেছেন, বাংলা তাঁর দ্বিতীয় ঘর। এই ঘরের জন্যই মন কাঁদবে। অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত থাকবেন এবং থাকতেন চান বাংলার সঙ্গে। স্মরণ করলেন মহাত্মা গান্ধীর কথা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা। 

লোকভবন, কলকাতা, সোশ্যাল মিডিয়া পেজ থেকে শেয়ার করা হয়েছে ওই চিঠি। তাতে লেখা-

'পশ্চিমবঙ্গের মানুষের উদ্দেশে উন্মুক্ত পত্র
আমার প্রিয় বঙ্গবাসী ভাই ও বোনেরা,
লোক ভবন, কলকাতায় আমার দায়িত্বের অধ্যায় শেষের পথে এসে পৌঁছেছে। এই মুহূর্তে আমি আবারও আপনাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই—আপনারা যে সমর্থন, স্নেহ ও সম্মান আমাকে দিয়েছেন, তার জন্য আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।
আমাদের প্রিয় এই রাজ্যের স্নেহময় ও সহৃদয় মানুষের সান্নিধ্যে কাটানো মুহূর্তগুলো আমি আজও সযত্নে স্মরণ করি। আমি মনে করি সেই বোনের আলিঙ্গন, সেই ছোট্ট ছেলেটির পিঠে আলতো চাপড়, সেই তরুণের দৃঢ় করমর্দন, আর দূর থেকে উঁচু করে ওঠা সেই হাতের শক্তিশালী বার্তা।
যদিও আমার দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হয়েছে, তবু পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমার পথচলা এখানেই শেষ নয়। পশ্চিমবঙ্গ—আমার দ্বিতীয় ঘর—এর সঙ্গে আমি অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত থাকব এবং থাকতেই চাই।
অনেক দশক আগে মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন—
“আমি বাংলা ছেড়ে যেতে পারছি না, আর বাংলা আমাকে ছেড়ে যেতে দেবে না।”
আজ আমি সেই একই অনুভূতি ভাগ করে নিচ্ছি। এই পবিত্র মাটির এমন এক আকর্ষণ রয়েছে, যা বিদ্যুতের মতো হৃদয়কে টেনে নেয়। এই মাটিই জন্ম দিয়েছে এমন বহু মহামানব ও মহীয়সী নারীকে, যাঁরা সমগ্র দেশকে পথ দেখিয়েছেন।
এই প্রসঙ্গে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর বাণী আমার মনে পড়ে। তিনি লিখেছিলেন—
“এই জপ, এই গান, এই মালা গোনা ছেড়ে দাও…
তিনি আছেন সেখানে, যেখানে চাষি কঠিন মাটিতে লাঙল চালাচ্ছে,
আর যেখানে পথ নির্মাতা পাথর ভেঙে পথ তৈরি করছে…”
আমি সেই ঈশ্বরকে খুঁজে পেতে চেয়েছিলাম—এবং তাঁকে খুঁজে পেয়েছি কলকাতার অলিগলিতে, গ্রাম ও শহরের পথে, শিশুদের উজ্জ্বল ও উৎসাহী চোখে, প্রবীণদের স্নেহময় দৃষ্টিতে।
বন্ধুগণ, গত তিন বছরে আমি এই রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছি এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেছি। আমি গ্রামবাসীদের খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘরে বসে তাঁদের সঙ্গে আহার করেছি; তরুণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পড়াশোনা করেছি; জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। আমাদের ভাই-বোনদের সামাজিক মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের প্রতি যে গভীর গর্ব রয়েছে, তা বাঙালি মননের গভীরতা ও মহিমার সাক্ষ্য বহন করে।
বন্ধুগণ, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—পশ্চিমবঙ্গের আমার ভাই ও বোনেরা আগামী দিনে আরও মহান উচ্চতায় পৌঁছবেন। আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী সেই পথচলায় বিনম্রভাবে অবদান রেখে যাব।
আগামী দিনে বঙ্গভূমি আরও গৌরবের শিখরে পৌঁছাক—এই আমার আন্তরিক প্রার্থনা। সকলের জীবনে আসুক সমৃদ্ধি, শান্তি ও সুস্বাস্থ্য।
মা দুর্গা আমার প্রিয় মানুষের সকলকে রক্ষা করুন।
বন্দে মাতরম্।
ড. সি. ভি. আনন্দ বোস
মাননীয় রাজ্যপাল, পশ্চিমবঙ্গ।'


উল্লেখ্য, মঙ্গলবার মমতা ব্যানার্জি বলেন, 'যেহেতু উনি (সি ভি আনন্দ বোস) কাল চলে যাচ্ছেন। ওনার সঙ্গে একসঙ্গে অনেকদিন কাজ করেছি। ওনার পরিবারকে আমি চিনি। বাংলার শিষ্টাচার হিসেবে আমি তাঁর মঙ্গল কামনা করি। তাঁর প্রতি যে অবিচার হয়েছে, অন্যায় হয়েছে। পাঁচ বছরের টার্ম শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি এখনও মনে করি এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।' তিনি আরও বলেন, 'আমি আমার মনের কথা তাঁকে বলে এসেছি। আমি ওনাকে অনুরোধ করেছি, আপনি এতদিন বাংলায় ছিলেন, বাংলাকে ভাল বোঝেন, বাংলায় আবার ফিরে আসুন। এই টুকুই।'