কৃশানু মজুমদার: কিছু সম্পর্কের শেষ বাঁশি বাজে না। সময় বদলায়, ঠিকানা বদলায়, জার্সির রং বদলায়, কিন্তু হৃদয়ের এক কোণে সেই সম্পর্কের রেশ থেকে যায় চিরকাল। হিজাজি মাহের আর ইস্টবেঙ্গলের সম্পর্কটা ঠিক তেমনই।
জর্ডনের মরুভূমি পেরিয়ে কলকাতায় এসে যে মানুষটা লাল-হলুদের প্রেমে পড়েছিলেন, তিনি আজও সুযোগ পেলেই চোখ রাখেন ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচে। দূরদেশে বসেও তাঁর মন পড়ে থাকে যুবভারতীর কংক্রিটের গ্যালারিতে। যেখানে হাজার হাজার কণ্ঠ একসঙ্গে সুর করে বলে ওঠে, 'ইস্টবেঙ্গল-ইস্টবেঙ্গল।'
লাল-হলুদের সাম্প্রতিক সাফল্যের খবর তাঁর অজানা নয়। আইএসএলে ইন্টার কাশীর বিরুদ্ধে ইস্টবেঙ্গলের 'ফাইনাল' দেখেছেন, উচ্ছ্বাস দেখেছেন, সমর্থকদের আনন্দ দেখেছেন। আর সেই আনন্দে নিজের অজান্তেই ভিজেছেন তিনিও।
জর্ডন থেকে ইস্টবেঙ্গলে খেলে যাওয়া হিজাজি মাহের আজকাল ডট ইনকে বলছেন, ''আমি খুব খুশি। ক্লাব, সমর্থক, ম্যানেজমেন্ট, সকলেই এই সাফল্যের যোগ্য। আমি নিজেও খুব খুশি হতাম যদি ইস্টবেঙ্গলের হয়ে আইএসএল জিততে পারতাম। কিন্তু আপনি তো জানেন, এটাই ফুটবল। আশা রাখব, আরও অনেক ট্রফি জিতবে ইস্টবেঙ্গল।'' হিজাজির কথাগুলো সংক্ষিপ্ত হলেও, তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল বহুদিনের ভালবাসা। তাঁর আবেগ সহজেই পড়া যায়।

লাল-হলুদ জার্সিতে তাঁর সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতি অবশ্যই সুপার কাপ। কার্লেস কুয়াদ্রাতের হাত ধরে যে দল ট্রফি জিতেছিল, সেই ইতিহাসের অংশ ছিলেন জর্ডনের এই ডিফেন্ডারও। সেই রাতের উল্লাস, ট্রফি হাতে ধরার মুহূর্ত, গ্যালারির গর্জন, সব এখনও স্পষ্ট তাঁর স্মৃতিতে।
কিন্তু ফুটবল তো কেবল রূপকথা নয়। এর ভাঁজে ভাঁজে থাকে অসমাপ্ত গল্প, না বলা অভিমান আর হঠাৎ নেমে আসা অন্ধকার।
কুয়াদ্রাতের বিদায়ের পর ইস্টবেঙ্গলের ডাগ আউটের ছবি বদলে গেল। সময়ের স্রোতও অন্যদিকে মোড় নিল। লেসলি ক্লডিয়াস সরণীর ক্লাব ছেড়ে চলে যেতে হল হিজাজি মাহেরকে। জর্ডনের তারকা বলছেন, ''ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে যাওয়ার সময়টা আমার জন্য খুব কঠিনই ছিল।''
তবু বিদায় মানেই বিচ্ছেদ নয়। আজও ইস্টবেঙ্গল ফুটবলারদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। আজও তিনি প্রাক্তন ক্লাবের ম্যাচ দেখেন। সমর্থকদের প্রসঙ্গ উঠলে তাঁর গলায় যেন অন্য এক উষ্ণতার ছোঁয়া পাওয়া যায়। হিজাজি বলছেন, ''ইস্টবেঙ্গল আমার প্রিয় দলগুলোর একটি। আমি খুব সুখে ছিলাম। ভাল ছিলাম। তবে কিছু বিষয় আছে যা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমাগো ফ্যানরা আমার দেখা সেরা সমর্থকদের মধ্যে অন্যতম। তাঁরা সবসময় আমার পাশে ছিল। এখনও তাঁরা আমাকে ভুলে যায়নি।'' ইস্টবেঙ্গল তাঁর কাছে নিছক কোনও ক্লাব নয়। এই শহরও তাঁর কাছে কেবলমাত্র একটা শহর নয়। হিজাজি
মাহেরের কাছে ভারত এখনও তাঁর দ্বিতীয় বাড়ি। কলকাতা এখনও তাঁর কাছে দ্বিতীয় শহর। আর ইস্টবেঙ্গল? সেটি যেন তাঁর জীবনের এক অসমাপ্ত অধ্যায়। হিজাজি বলছেন, ''ভবিষ্যতে যদি আবার প্রস্তাব আসে, আমি ফিরে আসব ইস্টবেঙ্গলেই।'' নিঃসঙ্কোচে বলছেন হিজাজি।
কিন্তু 'ফিরে আসব' বললেই তো ফেরা যায় না। হিজাজির এই কথার মধ্যে ফুটে উঠছে ক্লাবের প্রতি গভীর এক টান।
কলকাতা ছেড়ে জর্ডনে ফিরে আসার পরে জীবন তাঁকে অন্য এক লড়াইও শিখিয়েছে। বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন ছিল চোখে। জর্ডনের বাছাইপর্বের দলে ছিলেন। বেশ কয়েকটি ম্যাচও খেলেছেন। জাতীয় দলের জার্সিতে ফুটবলের বড় মঞ্চে নিজেকে দেখার স্বপ্নও ছিল। কিন্তু চোট এসে তাঁর স্বপ্ন এলোমেলো করে দেয়।

এখন তিনি বিশ্বকাপ দেখছেন দর্শক হিসেবে। হয়তো কখনও কখনও মনে হয়, সব ঠিক থাকলে তিনিই তো মাঠে নামতেন। ইতিহাসের অংশ হতেন। হিজাজি বলছেন, ''চোট এসে সবকিছু বদলে দেয়। এটাই ফুটবল, বন্ধু। আমি আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরব, এটা নিশ্চিত। এখন আমি চোট সারিয়ে উঠেছি। ধীরে ধীরে আবার খেলায় ফিরছি। তবে একটা কথা বলতে চাই, সেই সময়ে আমার ফিটনেস বিশ্বকাপ খেলার মতো জায়গায় ছিল না।'' গ্রুপ জে-তে জর্ডনের গ্রুপে রয়েছে আর্জেন্টিনা, অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া। এদিন আলজেরিয়ার কাছে ২-১ গোলে হার মেনেছে জর্ডন। প্রথম ম্যাচে অস্ট্রিয়ার কাছে ৩-১ গোলে হার মানে জর্ডন। তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়ে গিয়েছে। গ্রুপের শেষ ম্যাচে লিও মেসির আর্জেন্টিনার মুখোমুখি জর্ডন। হিজাজি মাহের বলছেন, ''আমাদের গ্রুপটা খুব কঠিন—অস্ট্রিয়া, আলজেরিয়া এবং আর্জেন্টিনা। মেসির বিরুদ্ধে খেলা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।''
ফুটবলের বাইরে তিনি নতুন এক পথের সন্ধান পেয়েছেন। সম্প্রতি এডুকেশন নিয়ে মাস্টার্স করেছেন। বইয়ের পাতায়, শিক্ষার আলোয় তিনি খুঁজে নিচ্ছেন জীবনের আরও একটি পরিচয়। উচ্চশিক্ষা নিয়ে আরও এগিয়ে যেতে চান জর্ডনের এই তারকা।
সময়ের স্রোত অনেক কিছু বদলে দেয়। তবু কিছু রং মুছে যায় না। হিজাজির জীবনে লাল-হলুদ রং উজ্জ্বল হয়ে আছে। তিনি বলছেন, ''ভারতে, বিশেষ করে ইন্ডিয়ান সুপার লিগে কাটানো দু'বছর আমার জন্য খুব আনন্দের ছিল।'' মাঠের লড়াই আর শিক্ষার সাধনা, দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আজও তিনি মনে রাখেন কলকাতার সেই লাল-হলুদ দিনগুলোকে। আর তাই হাজার মাইল দূরে থেকেও তাঁর স্বীকারোক্তি, ''ইস্টবেঙ্গল আমার দ্বিতীয় ঘর।''















