আজকাল ওয়েবডেস্ক:একসময়ে প্রতিপক্ষের নামী দামি স্ট্রাইকারদের পা থেকে বল কেড়ে নিতেন। কংক্রিটের ভূখণ্ড থেকে ভেসে আসত তাঁর জন্য প্রশংসা। আজ সেই মানুষটিই তেহট্ট-দেবগ্রাম রুটের একটি বাসে যাত্রীদের টিকিট কাটেন। কাঁধে টাকার ব্যাগ, হাতে টিকিটের বান্ডিল, এটাই এখন তাঁর প্রতিদিনের পরিচয়। কিন্তু এই সাধারণ কন্ডাক্টরের অতীত জানলে অনেকেই অবাক হবেন। তিনি সাহেব আলি ঘরামি। ইস্টবেঙ্গলের প্রাক্তন ডিফেন্ডার, যার জীবন যেন ফুটবলের সাফল্য, স্বপ্নভঙ্গ এবং অদম্য লড়াইয়ের এক জীবন্ত দলিল।

জীবন কখনও কখনও এমন সব গল্প লিখে দেয়, যা কোনও সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। সাহেব আলির জীবনও ঠিক তেমনই। স্বপ্ন, সাফল্য, আঘাত, সংগ্রাম আর শেষ পর্যন্ত মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার এক অনুপ্রেরণার গল্প। 

নদিয়ার পলাশীপাড়া এলাকার পারকুলা গ্রামের এক দরিদ্র দিনমজুর পরিবারে জন্ম তাঁর। সংসারে ছিল অভাব, কিন্তু বড় স্বপ্ন দেখতেন সেই ছোটবেলা থেকেই। ছেলেবেলা থেকেই ফুটবল ছিল তাঁর পৃথিবী। গ্রামের মাঠে খালি পায়ে দৌড়তে দৌড়তেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন একদিন বড় ফুটবলার হওয়ার। সেই স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি দারিদ্র্য কিংবা অনিশ্চয়তা।

স্থানীয় টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক ভাল খেলার সুবাদে ধীরে ধীরে পরিচিত হতে থাকেন সাহেব আলি। ২০০৪ সালের একটি টুর্নামেন্ট বদলে দেয় তাঁর ভাগ্যের চাকা। সেই ম্যাচ দেখে কলকাতার ময়দানের একাধিক ক্লাবকর্তার নজরে পড়েন তিনি। তারপর গ্রামের ছেলে পা রাখেন কলকাতার ফুটবলে। শুরু হয় কঠোর পরিশ্রম, নিজেকে প্রমাণ করার অবিরাম লড়াই। 

২০০৭ সালে পূরণ হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। ইস্টবেঙ্গলের লাল-হলুদ জার্সি গায়ে চাপিয়ে মাঠে নামেন তিনি। প্রথমদিকে মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য ও সুভাষ ভৌমিকের তত্ত্বাবধানে সুযোগ পান। পরে কোচ ফিলিপ ডি রাইডারের আমলে প্রথম একাদশের নিয়মিত মুখ হয়ে ওঠেন। ডিফেন্সে তাঁর দৃঢ়তা, নিখুঁত ট্যাকল এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দেওয়ার দক্ষতা তাঁকে অল্প সময়েই সমর্থকদের আস্থার প্রতীক করে তোলে। কলকাতার ময়দানে অনেক নামী স্ট্রাইকারই তাঁর সামনে সাবধানে খেলতেন।

কিন্তু খেলাধুলার জগত যেমন সাফল্যের, তেমনই অনিশ্চয়তারও। ইস্টবেঙ্গলের পর মহামেডান স্পোর্টিংয়ে যোগ দিয়ে আরও বড় কিছুর স্বপ্ন দেখছিলেন সাহেব আলি। ঠিক সেই সময়, ২০১৩ সালে গুরুতর চোট তাঁর ফুটবলজীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। দীর্ঘ পুনর্বাসন, অনিশ্চয়তা আর লড়াইয়ের পরও আর আগের জায়গায় ফেরা সম্ভব হয়নি। পরে পিয়ারলেস ক্লাবের হয়ে দীর্ঘদিন খেললেও সেই সোনালি সময় আর ফিরে আসেনি।

জীবনের আরেকটি সিদ্ধান্ত আজও তাঁকে ভাবায়। ২০১০ সালে ফুটবল কোটায় ওএনজিসিতে চাকরির সুযোগ এসেছিল। কিন্তু তখন ফুটবলই ছিল তাঁর প্রথম ভালোবাসা। বড় স্বপ্নের আশায় চাকরির সুযোগ ছেড়ে দিয়েছিলেন। পরে সময়ের সঙ্গে বুঝেছেন, জীবনের মোড় অনেক সময় একটিমাত্র সিদ্ধান্তেই বদলে যায়।

সংসার অবশ্য স্বপ্নের ভাষা বোঝে না। সে বোঝে দায়িত্বের হিসাব। স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের মুখের দিকে তাকিয়ে নিয়মিত আয়ের পথ খুঁজতে হয় তাঁকে। ফুটবল আর সংসার একসঙ্গে টানা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই একদিন জার্সি খুলে হাতে তুলে নিতে হয়েছে টিকিটের বান্ডিল। আজ তিনি তেহট্ট-দেবগ্রাম রুটের বাসের কন্ডাক্টর। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত যাত্রীদের ভাড়া তোলাই তাঁর পেশা।

তবু ফুটবল তাঁর জীবন থেকে হারিয়ে যায়নি। কাজের ফাঁকে ডাক পেলেই স্থানীয় টুর্নামেন্টে খেলতে ছুটে যান। গ্রামের মাঠে বল পায়ে নিলেই যেন সময় থমকে দাঁড়ায়। তখন আর তিনি বাসের কন্ডাক্টর নন। আবারও সেই পুরনো ডিফেন্ডার, যিনি প্রতিপক্ষের আক্রমণ থামিয়ে দিতেন দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে।

নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “এখন আর নিয়মিত ফুটবল খেলার সুযোগ পাই না। ডাক পেলে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় খেলতে যাই। বড় ক্লাবে খেলার যে অনুভূতি ছিল, সেটা আর কোনও দিন ফিরে পাব না। অনেক সময় অর্থের অভাবে নিজের এলাকায় খেলা দেখতেও যেতে পারি না। সংসারের কথা ভেবেই অন্য পেশায় আসতে হয়েছে।”

এই গল্প কেবল একজন প্রাক্তন ফুটবলারের নয়। এটি সেইসব ক্রীড়াবিদদের প্রতিচ্ছবি, যাঁরা মাঠে দেশের বা ক্লাবের জন্য লড়াই করেন, অথচ কেরিয়ার শেষ হওয়ার পর জীবনের কঠিন বাস্তবের সঙ্গে একা লড়তে হয়। আলো নিভে গেলে গ্যালারি আর তাদের মনে রাখে না, কিন্তু জীবন যে থেমে থাকে না।

তবুও সাহেব আলি ঘরামি হার মানেননি। প্রতিদিন বাসের হুইসেলের শব্দের মাঝেও তিনি বুকের ভিতর আগলে রেখেছেন ময়দানের গর্জন। তাঁর হাতে আজ টিকিটের বান্ডিল, কিন্তু হৃদয়ে এখনও লাল-হলুদের স্পন্দন। হয়তো এটাই একজন প্রকৃত ফুটবলারের আসল পরিচয়। জার্সি খুলে রাখা যায়, কিন্তু ফুটবলকে কোনও দিন হৃদয় থেকে সরিয়ে রাখা যায় না।