আজকাল ওয়েবডেস্ক: দুই বছরের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সহিংস অস্থিরতার পর মঙ্গলবার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রধান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। প্রাণঘাতী বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষত বয়ে চলা দেশকে স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠনের পথে ফেরানোই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।


প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২১২টি আসনে জয় পায়। এই বিপুল জয় নতুন সরকারের প্রতি জনসমর্থনের ইঙ্গিত দিলেও প্রত্যাশার চাপও বাড়িয়েছে বহুগুণ।


নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দ্রুত বৃদ্ধির যে ধারা তৈরি হয়েছিল, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও হিংসার কারণে তা বড় ধাক্কা খেয়েছে। বিনিয়োগ কমেছে, রপ্তানি খাত চাপের মুখে পড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও টান পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে তারিক সরকারের অগ্রাধিকার।


তবে অর্থনীতির পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে রাজনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ইউনুসের নেতৃত্বে প্রণীত ‘জুলাই সনদ’ গণভোটে অনুমোদিত হয়েছে এবং নতুন সরকারকে সংবিধান ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহে পরিবর্তন আনার ম্যান্ডেট দিয়েছে। এই সনদের আলোকে সাংবিধানিক সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।


কিন্তু শপথ গ্রহণের দিনই রাজনৈতিক উত্তাপের ইঙ্গিত মিলেছে। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট শপথ অনুষ্ঠান বয়কট করে। বিএনপি সাংসদরা সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় তারা অসন্তোষ প্রকাশ করে। বিরোধী শিবির হুঁশিয়ারি দিয়েছে, সংস্কার কার্যকর না হলে রাজপথে আন্দোলনে নামবে। অর্থনৈতিকভাবে নাজুক অবস্থায় থাকা দেশের জন্য নতুন করে হিংসার আন্দোলন বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।


কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অন্তর্বর্তী আমলে ঢাকা–নয়াদিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। এখন দুই দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রত্যাশা করছে। তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপির নির্বাচনী জয়ে তারিক রহমানকে অভিনন্দন জানান। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে ইতিবাচক বার্তা দিতে চাইবে।


তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় রয়েছেন ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী, যাদের মধ্যে দু’জন প্রযুক্তিবিদ। মন্ত্রিসভায় এক জন হিন্দু ও এক জন বৌদ্ধ সংসদ সদস্যের অন্তর্ভুক্তি অন্তর্ভুক্তিমূলক বার্তা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।


সব মিলিয়ে, বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এলেও তারেক রহমানের সামনে পথ মোটেই মসৃণ নয়। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, সাংবিধানিক সংস্কার ও আঞ্চলিক কূটনীতির ভারসাম্য রক্ষা—এই তিন অক্ষেই নির্ধারিত হবে তাঁর নেতৃত্বের সাফল্য বা ব্যর্থতা। বাংলাদেশ এখন তাকিয়ে আছে নতুন সরকারের প্রথম পদক্ষেপগুলোর দিকে।