বার বার গর্ভপাত হলে স্বাভাবিকভাবেই দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। ভবিষ্যতে সুস্থ সন্তানের বাবা-মা হতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন অনেক দম্পতি। ঠিক কোন কারণে হয় এই সমস্যা, কীভাবেই বা মিলবে সমাধান? এবিষয়ে জানালেন আভা সার্জি সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ও চিফ কনসালটেন্ট ড. বাণী কুমার মিত্র।
বারবার গর্ভপাত বা রিকারেন্ট মিসকারেজ কী? গর্ভধারণের ২০ সপ্তাহের আগেই কোনও কারণে ভ্রুণ নষ্ট হয়ে গেলে তাকে গর্ভপাত বলা হয়। আর পরপর দু’বার বা তার বেশি গর্ভপাত হলে তাকে রিকারেন্ট মিসক্যারেজ বা বারবার গর্ভপাত বলা হয়। এই সমস্যা খুব বেশি মানুষের হয় না, তবে হলে এর পিছনে কোনও নির্দিষ্ট কারণ আছে কিনা, তা খুঁজে দেখা জরুরি।
বারবার গর্ভপাতের কারণ
ভ্রূণের জিনগত সমস্যা: বারবার গর্ভপাতের অন্যতম বড় কারণ হল ভ্রূণের ক্রোমোজোমে সমস্যা। অনেক সময় ভ্রূণের মধ্যে এমন কিছু জিনগত ত্রুটি থাকে, যার কারণে তার স্বাভাবিক বিকাশ সম্ভব হয় না। ফলে গর্ভের শুরুতেই গর্ভপাত হয়ে যেতে পারে। কখনও কখনও বাবা বা মায়ের শরীরে থাকা ক্রোমোজোমের কিছু পরিবর্তন তাঁদের নিজের শরীরে কোনও সমস্যা তৈরি করে না, কিন্তু গর্ভধারণের সময় সন্তানের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
জরায়ুর সমস্যা: জরায়ুর গঠন বা ভিতরের কোনও সমস্যা থাকলেও বারবার গর্ভপাত হতে পারে। কারণ ভ্রূণ জরায়ুতে ঠিকমতো স্থাপন হতে পারে না বা বড় হতে সমস্যা হয়। এর মধ্যে রয়েছে জরায়ুর ভিতরে অতিরিক্ত পর্দা থাকা, জরায়ুর ভেতরের অংশে ফাইব্রয়েড হওয়া, জরায়ুর মধ্যে ক্ষত বা আঠালো টিস্যু তৈরি হওয়া, জন্ম থেকেই জরায়ুর গঠনে সমস্যা থাকা, কিছু ক্ষেত্রে জরায়ুর পলিপ। অনেক ক্ষেত্রেই ছোট অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা যায়।
হরমোনের সমস্যা: শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলেও গর্ভধারণ ধরে রাখতে সমস্যা হতে পারে। যেমন থাইরয়েডের সমস্যা, নিয়ন্ত্রণে না থাকা ডায়াবেটিস, পিসিওএস (পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম), প্রোল্যাক্টিন হরমোন বেড়ে যাওয়া, কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় হরমোন কম থাকা।।সঠিক ওষুধ ও চিকিৎসার মাধ্যমে এই সমস্যাগুলি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সুস্থ গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ে।
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সমস্যা: কিছু ক্ষেত্রে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভুলভাবে নিজের গর্ভের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে।অ্যান্টিফসফোলিপিড সিনড্রোম (এপিএস) এমনই একটি সমস্যা। এতে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বেড়ে যায়। ফলে প্লাসেন্টায় রক্ত চলাচল কমে গিয়ে গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা: কিছু মহিলার শরীরে রক্ত সহজে জমাট বাঁধার প্রবণতা থাকতে পারে। এর ফলে প্লাসেন্টার মাধ্যমে ভ্রূণের কাছে প্রয়োজনীয় রক্ত ও পুষ্টি পৌঁছাতে সমস্যা হতে পারে। তবে সব ধরনের রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যার চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসক পরীক্ষার ফল দেখে সিদ্ধান্ত নেন।
বয়স ও জীবনযাপনের প্রভাব: মায়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর গুণগত মান কমতে পারে। বিশেষ করে ৩৫ বছরের পর ভ্রূণের ক্রোমোজোমে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে, যার ফলে গর্ভপাতের ঝুঁকিও বাড়ে।
এছাড়া ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান, অতিরিক্ত ওজন, দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণহীন রোগ, কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ গর্ভাবস্থায় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন? বেশ কয়েকটি পরিস্থিতিতে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যেমন পরপর দু’বার বা তার বেশি গর্ভপাত হলে, তিন মাসের মধ্যে গর্ভপাত হলে, ফার্টিলিটি চিকিৎসার পর গর্ভপাত হলে, পরিবারে জিনগত রোগের ইতিহাসu থাকলে, আগে থেকেই পরীক্ষা করলে অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয়।
বারবার গর্ভপাত মানেই ভবিষ্যতে সন্তান হবে না, এমনটা নয়। সঠিক কারণ খুঁজে বের করে চিকিৎসা শুরু করলে অনেক দম্পতিই সুস্থ সন্তানের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন। তাই গর্ভপাতের পর হতাশ না হয়ে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
















