সে এক সময় ছিল। বয়স আটান্ন কিংবা ষাট পেরোলেই রইল ঝোলা, চলল ভোলা। চাকরি এবং নিজস্ব কাজকর্ম দুটো থেকেই যাকে বলে পুরোপুরি অবসর। তারপর ছুটি আর ছুটি। কেউ মন দিতেন বুড়ো-বুড়ির সংসারে। কেউ বেরোতেন তীর্থ করতে, কেউ দেশভ্রমণে। কেউ বা নিজেকে বাতিলের খাতায় লিখে ফেলে মনখারাপেই কাটিয়ে দিতেন জীবনের বাকি সময়টা।
কিন্তু ক্রমে যুগটাই যে বদলে গেল আপাদমস্তক। এই ছোটাছুটিময় জীবনধারায় ষাট পেরনো মানে এখন নিজেকে বা অন্যকে বুড়ো কিংবা বাতিল বলতে নারাজ অনেকেই। বরং ‘লাইফ বিগিনস অ্যাট সিক্সটিতে’ই ভরপুর বিশ্বাস। চাকরি থেকে খাতায় কলমে অবসর বটে। কিন্তু নিজেকে ছুটির মেজাজে বুনে নিয়েও নতুন করে জীবনটাকে গড়ে নিচ্ছেন বেশির ভাগই। ছুটিতেও ছুটছেন নিজস্ব গতিতে। যাকে বলে কেরিয়ারের সেকেন্ড ইনিংস। কিংবা হয়তো পারিবারিক প্রয়োজনেই আপনার উপার্জন চালিয়ে যাওয়াটা দরকার। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরেও তাই নতুন করে কাজের দুনিয়ায় পা রাখতেই পারেন।
কর্মজীবন-খাতার এই দ্বিতীয় ভাগে এসে কাজের সুযোগও কিন্তু নেহাত কম নয়। চাইলেই যেমন রোজগার করা যাবে, তেমনই সময়ও কাটবে নিজস্ব ছন্দে। আগেকার যুগের মতো নিজেকে বাতিল ভেবে মনখারাপের প্রয়োজনও পড়বে না আর। আর তার জন্য দরকার শুধু খানিকটা মানসিক প্রস্তুতি আর নিজের ইচ্ছে, কর্মক্ষমতা আর পছন্দ অনুযায়ী কাজ এবং তাতে দেওয়ার মতো সময় বেছে নেওয়া। এবং প্রয়োজন পড়লে অল্পস্বল্প পড়াশোনা বা ছোটখাটো কোর্স করে নেওয়া। কারণ এবারের কেরিয়ারে আপনিই আপনার বস। আপনিই ঠিক করবেন কী করবেন, কতটা করবেন।
তাহলে বরং এবার জেনে নেওয়া যাক অবসর-পরবর্তী সেকেন্ড ইনিংসে কী কী করতে পারেন।
কনসাল্টেশন এবং মেন্টরিং: এত বছরের অভিজ্ঞতা আপনার ঝুলিতে। বড়সড় দায়িত্ব, প্রোজেক্টের চাপ সামলেছেন দীর্ঘদিন। খাতার পাতায় নয়, একেবারে হাতেকলমে কাজে একের পর এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে সাফল্য পেয়েছেন বছরের পর বছর। সে ইঞ্জিনিয়ারিং হোক বা মার্কেটিং, এইচআর হোক বা সেলস— আপনার পেশায় আসা নতুনদের তৈরি করে দিতে সেই বাস্তব অভিজ্ঞতার কিন্তু জুড়ি নেই। তাই বহু কর্পোরেট অফিস বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আজকাল অবসরপ্রাপ্ত সফল পেশাদারদের কনসালট্যান্ট বা মেন্টর হিসেবে নিয়োগ করে। উপার্জনের সুযোগ যেমন কম নয়, তেমনই যোগ্য উত্তরসূরি তৈরি করতে পারার তৃপ্তিও কম নয় কিন্তু!
ফিনান্সিয়াল প্ল্যানিং এবং বাজেট সাপোর্ট: বহু ছোট ব্যবসা বা নতুন প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসা, টাকাপয়সা বা লাভ-লোকসান সামলাতে হিমশিম খায়। আপনি যদি দীর্ঘকাল ফিন্যান্স কিংবা অ্যাকাউন্টিংয়ের মতো পেশায় কাটিয়ে থাকেন তবে মার্কেট বা তার ওঠাপড়া নিয়ে অনেকের থেকেই আপনার জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা দুটোই বেশি। সে ক্ষেত্রে এই ছোট বা নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর ভরসা হয়ে উঠতে পারেন আপনিই। তাদের সিনিয়র কর্মী, কনসালট্যান্ট কিংবা ফ্রিল্যান্স সাপোর্ট— যে ভাবে খুশি কাজ এবং উপার্জনের সুযোগ রয়েছে এ ক্ষেত্রে। সঙ্গে যদি যুগোপযোগী কিছু ফিনান্সিয়াল টুল বা সফটওয়্যারের কার্যকারিতা আয়ত্ত করে নিতে পারেন, তবে তো সোনায় সোহাগা!
কর্পোরেট ট্রেনিং ও ওয়ার্কশপ: ভাবছেন কোনও প্রতিষ্ঠানে যোগ না দিয়ে সেল্ফ এমপ্লয়েড হিসেবেই ভাগ করে নেবেন নিজের অভিজ্ঞতা? সেটাই ভাল তবে। বিভিন্ন অফিস বা ব্যবসাক্ষেত্রে নানা সময়েই কর্মীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ট্রেনিং বা ওয়ার্কশপের আয়োজন হয়। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেই প্রশিক্ষণ বা কর্মশালা করাতে পারেন আপনিও। আপনার পুঁজি তো আপনার কাছেই আছে। আপনার এতকালের অভিজ্ঞতা!
লেখালেখি এবং কনটেন্ট রাইটিং: লিখতে ভালবাসতেন বরাবরই। সুযোগ পেতেন না কাজের চাপে। নানা ধরনের বিষয়ে আগ্রহ যেমন আছে, তেমনই আছে পড়াশোনার খিদে। বেশ তো! এটাই হোক না আপনার দ্বিতীয় ইনিংসের মাস্টারস্ট্রোক। কোনও প্রকাশনার চাহিদামাফিক লেখালেখি বা অনুবাদ করতে পারেন। কিংবা বই লিখে সেল্ফ পাবলিশ করতে পারেন নিজের পছন্দের বিষয়ে। অথবা এখন বহু সংস্থাই তাদের ওয়েবসাইট, নিউজলেটার কিংবা বিজ্ঞাপনী লেখালেখির প্রয়োজনে কনটেন্ট রাইটার খোঁজে। ফ্রিল্যান্সে সেই কাজের সুযোগও কিন্তু রয়েছে।
রিমোট টিউটোরিয়াল বা কোচিং ক্লাস: বহুবছর স্কুল বা কলেজে পড়িয়েছেন। সেই পড়ানোর অভিজ্ঞতা দিয়েই এই অবসরের দিনগুলোতে কোচিং ক্লাস শুরু করতে পারেন বাড়িতে কিংবা পছন্দের কোনও জায়গায়। যোগ দিতে পারেন কোনও কোচিং ইনস্টিটিউটেও। আজকাল আর শরীর দেয় না তবু পড়াতে ইচ্ছে করে? অসুবিধে কী? বহু অনলাইন বা রিমোট টিউটোরিয়াল রয়েছে ইদানীং। নিতে পারেন অনলাইন ক্লাস। কিংবা রেকর্ডেড লেকচার বিক্রি করে উপার্জনের সুযোগও রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির ব্যবহারের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারলেই খুলে যাবে এই দুনিয়াটার দরজা।
কমিউনিকেশন অ্যান্ড প্রেজেন্টেশন স্কিল সাপোর্ট: কীভাবে কথা বলতে হয় ক্লায়েন্ট মিটিংয়ে, কীভাবে তৈরি করতে হয় প্রেজেন্টেশন কিংবা সেলস পিচ ডেক— এসব নিয়ে ঠিকমতো ধারণা নেই বহু নতুন পেশাদারের। ফলে অফিসে বসের চোখরাঙানি নিত্যসঙ্গী, ক্লায়েন্টও হাতছাড়া! আপনার যদি এসব ক্ষেত্রে বহুকালের অভিজ্ঞতা থাকে, তবে আপনিই হয়ে উঠুন না ছোটদের ভরসাস্থল। ওয়ান-টু-ওয়ান কোচিং কিংবা ওয়ার্কশপ করে শিখিয়ে দিতে পারেন তাদের। আর সেভাবেই কিন্তু কমিউনিকেশন অ্যান্ড প্রেজেন্টেশন স্কিল সাপোর্ট হয়ে উঠতে পারে আপনার অবসরের পেশা।
কেরিয়ার অ্যান্ড লাইফ কোচিং: এ জীবন লইয়া কী করিব— এমন ধন্দে পড়ে বহু নতুন ছেলেমেয়েই। কোন পথে কেরিয়ার গড়বে, কোনটা হয়ে উঠতে পারে মানানসই পেশা, বাড়ির বড়দের মতে চলবে নাকি নিজেদের ইচ্ছেয়— সবটা নিয়েই বেধে যায় গোলমাল। আবার অনেকেই একটা নির্দিষ্ট পেশায় কিছুদিন কাটিয়ে ফেলার পরে বুঝতে পারে ভুল হয়ে গিয়েছে। ফলে ঘিরে ধরে হতাশা, অবসাদ কিংবা মানসিক চাপ। এদের সবাইকেই পথ দেখাতে পারে আপনার অভিজ্ঞতা। কোন পেশাটা কার মানানসই হতে পারে, কীভাবে ইন্টারভিউ দিলে আসতে পারে সাফল্য কিংবা পেশাগত হতাশা, অবসাদ বা স্ট্রেস থেকে বেরিয়ে এসে কীভাবে নতুন করে গড়ে নেওয়া যায় নিজেকে—সবটাই শেখাতে পারেন আপনি। তবে এর জন্য আপনাকেও কিন্তু একটু প্রস্তুতি নিতে হবে। করে নিতে হবে কেরিয়ার কাউন্সেলিং বা লাইফ কোচিংয়ের কোর্স।
শখের ব্যবসা: রান্না করতে ভালবাসেন কিংবা সেলাই করতে। অথবা শখেই নিজের হাতে বানাতে পারেন নানা রকম শৌখিন ক্রাফট। চাইলে সেই শখটাকেই কিন্তু এবার সময় দিতে পারেন। আর তাকে ঘিরেই তৈরি করে নিতে পারেন ছোট্ট একটা ব্যবসা। ভাল লাগার কাজে একটু উপার্জনও হলে মন্দ কী!
অবসর মানে আজকাল ছুটি নয় মোটেই। বরং নতুন করে শুরু। আর সেই ছুটির ছুট? আপনারই নিজস্ব ছন্দে-গতিতে। বাকিটা বলবে আপনার এতদিনকার অভিজ্ঞতার ম্যাজিক।















