মরুরাজ্য রাজস্থানের বুকে যখনই রাতের অন্ধকার নেমে আসে, বিঘার পর বিঘা বিস্তৃত ধুধু বালির মাঝে হঠাৎই জ্বলে ওঠে এক বিশাল অগ্নিকুণ্ড। চারপাশের ঘুটঘুটে অন্ধকারকে ফালাফালা করে দেয় টকটকে লাল গনগনে কয়লার চাদর। ঠিক তখনই গমগম করে ওঠে ঢোলের আওয়াজ, আর সেই ছন্দের সঙ্গে সঙ্গে ঘটতে থাকে এক অবিশ্বাস্য অলৌকিক কাণ্ড!
এক দল মানুষ কোনও রকম দ্বিধা বা ভয় ছাড়া সরাসরি পা রাখলেন সেই জ্বলন্ত কয়লার ওপর। রাজস্থানের বিকানের জেলার কাতরিয়াঁসার গ্রামের এই অদ্ভুত এবং রোমাঞ্চকর ঐতিহ্যই হল বিশ্ববিখ্যাত ‘অগ্নি নৃত্য’, যা রাজস্থানের লোকসংস্কৃতির অন্যতম রোমহর্ষক নিদর্শন।
শুরুর দিকে চারপাশের পরিবেশটা থাকে অত্যন্ত শান্ত ও আধ্যাত্মিক। কুশলী বাদকেরা ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শুরু করেন, চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে ভক্তিগীতিতে। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাজনার গতি বাড়তে থাকে। ঢোলের আওয়াজ যত জোরালো হয়, আশেপাশে জড়ো হওয়া মানুষদের মধ্যে উন্মাদনা ততই তীব্র হতে থাকে।
আর ঠিক চরম মুহূর্তে খালি পায়ে জ্বলন্ত কয়লার ওপর নেমে পড়েন নৃত্যশিল্পীরা! এক ফুট, দু'ফুট নয়। কয়েক মিটার জুড়ে বিছানো গনগনে লাল কয়লার ওপর দিয়ে তাঁরা কেবল হেঁটে যান না, রীতিমতো নাচের বিভিন্ন মুদ্রা প্রদর্শন করেন। সাধারণ দর্শকদের কাছে যা এককথায় অসম্ভব বা অলৌকিক মনে হয়, এই শিল্পীদের পায়ের মুদ্রায় তা চরম আত্মবিশ্বাস ও স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে ফুটে ওঠে। তাঁদের কাছে এই আগুন কোনও মরণপণ চ্যালেঞ্জ নয়, বরং তাঁদের পরম বিশ্বাসের এক পবিত্র অংশ।
এই রোমহর্ষক রীতির সূচনা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে, ১৫ শতকের মহান সাধক জাসনাথ জি-র শিক্ষার হাত ধরে। ওঁর অনুগামীরা অর্থাৎ রাজস্থানের ‘জাসনাথী’ সম্প্রদায় আজও এই ঐতিহ্যকে কঠোরভাবে টিকিয়ে রেখেছেন। আর এটি কিন্তু স্রেফ বিনোদন বা কোনও স্টান্ট শো নয়; এটি জাসনাথী সম্প্রদায়ের গভীর ধর্মীয় উৎসব ও সম্মেলনের একটি পবিত্র অঙ্গ। এই নৃত্যে অংশ নেওয়ার আগে শিল্পীদের বেশ কয়েক দিন ধরে কঠোর মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি নিতে হয়। রাতের অন্ধকারে যখন লাল কয়লার আভা, ঢোলের গম্ভীর আওয়াজ আর ভক্তদের মন্ত্রোচ্চারণ একসঙ্গে মিশে যায়, তখন সেখানে এক অতিপ্রাকৃতিক বা অলৌকিক মায়াজাল তৈরি হয়।
আজকের দিনে যখন বিনোদন বলতে মানুষ শুধুই মোবাইল স্ক্রিন বা ইলেকট্রনিক মিডিয়া বোঝে, তখন রাজস্থানের এই অগ্নি নৃত্য প্রমাণ করে দেয় যে প্রাচীন সংস্কৃতির জোর কতটা বেশি। এই অবিশ্বাস্য দৃশ্য নিজের চোখে দেখার জন্য প্রতি বছর ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত তো বটেই, এমনকী সাতসমুদ্র পারের বিদেশি পর্যটকেরাও বিকানেরের এই ছোট্ট গ্রামে এসে ভিড় জমান।
বহু শতাব্দী পেরিয়ে আজও জাসনাথী সম্প্রদায়ের কাছে এই নৃত্য স্রেফ একটি প্রদর্শনী নয়— এটি হল এক জীবন্ত ঐতিহ্য। যেখানে রাজস্থানের মরুভূমির খোলা আকাশের নিচে মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি আর জ্বলন্ত আগুন একসাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।















