যেদিকে চোখ যায়, চারদিকে শুধু সাদা বরফ। যেন কেউ লম্বা একটা  পরিয়ে দিয়েছে চরাচর জুড়ে। আবহাওয়াও তাই তাপমাত্রা হিমাঙ্কের বহু নীচে। কনকনে ঠান্ডা ঠিক কতটা, তা ট্রপিক্যাল দেশের অ্যান্টার্কটিকার সেই জনমানবহীন, নিস্তব্ধ ‘নোভোলাজারেভস্কায়া’ সোভিয়েত রিসার্চ স্টেশনে তখন থমথমে পরিবেশ। ১৯৬১ সালের এপ্রিল মাস। স্টেশনের একমাত্র ডাক্তার, মাত্র ২৭ বছর বয়সী তরুণ সার্জন লিয়োনিড রোগোজভ হঠাৎ তীব্র পেটের যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠলেন। আর সে ব্যাথা এলেবেলে নয়! পেট চিরে যাওয়ার মতো যন্ত্রণা। অভিজ্ঞ ডাক্তার বুঝতে পারলেন, এ সাধারণ পেটব্যথা নয়— তীব্র ‘অ্যাকিউট অ্যাপেন্ডিসাইটিস’। চটজলদি অস্ত্রোপচার না হলে মৃত্যু অবধারিত। কিন্তু মুশকিল হল, হাজার কিলোমিটারের মধ্যে দ্বিতীয় কোনও ডাক্তার নেই, আর বাইরে তখন চলছে ভয়ঙ্কর তুষারঝড়। তাই খবর পাঠালেও বিমান বা উদ্ধারকারী দল আসার কোনও রাস্তাই খোলা ছিল না।

মৃত্যু যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন রোগোজভ এক অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি বুঝলেন, যদি বাঁচতে হয়, তবে নিজের অস্ত্রোপচার নিজেকেই করতে হবে! চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে যা আগে কেউ কখনও কল্পনাও করতে পারেনি।

৩০শে এপ্রিলের সেই কালরাত্রি। রোগোজভ নিজেই নিজের রুদ্ধশ্বাস অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি শুরু করলেন। বিছানায় আধশোয়া হয়ে নিজের পেটে লোকাল অ্যানেশেসিয়া (অজ্ঞান করার ওষুধ) ইনজেক্ট করলেন তিনি। তাঁর সঙ্গী বলতে রিসার্চ স্টেশনেরই দুজন সাধারণ কর্মী, যাঁদের চিকিৎসার কোনও অভিজ্ঞতাই নেই। একজন ধরে রইলেন একটা ছোট আয়না আর অন্যজন টেবিল ল্যাম্প।

তারপর শুরু হল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমহর্ষক অস্ত্রোপচার। নিজের পেটে নিজেই ছুরি চালালেন রোগোজভ!

পরবর্তী সময়ে সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা মনে করে রোগোজভ লিখেছিলেন, "আমি কোনো গ্লাভস না পরেই কাজ করছিলাম। আয়নায় উল্টো প্রতিচ্ছবি দেখে হাত চালানো যে কী ভয়ানক বিভ্রান্তিকর, তা বোঝানো অসম্ভব। তার ওপর প্রচণ্ড ক্লান্তি আর বমি বমি ভাব আসছিল বারবার। মাঝে মাঝেই মনে হচ্ছিল এই বুঝি জ্ঞান হারিয়ে ফেলব। প্রতি ৫-১০ মিনিট অন্তর আমাকে একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার শক্ত হতে হচ্ছিল।”

টানা দু’ঘণ্টার এক চরম স্নায়ুযুদ্ধের পর, রোগোজভ শেষমেশ নিজের সংক্রামিত অ্যাপেন্ডিক্সটি খুঁজে বের করে কেটে বাদ দিতে সফল হন। কাটার মুহূর্তে তিনি দেখেন, অ্যাপেন্ডিক্সটি ফেটে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে ছিল! আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা দেরি হলে বিষাক্ত পুঁজ পেটে ছড়িয়ে মারা যেতেন তিনি।অপারেশন শেষ করে নিজেই নিজের পেটে সেলাই দেন এই লড়াকু ডাক্তার। এর পর কয়েকদিন তীব্র ধকল আর জ্বরের পর, মাত্র দু’সপ্তাহের মাথায় তিনি আবার সুস্থ হয়ে নিজের ডিউটিতে ফিরে আসেন।

ছয় দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, কিন্তু অ্যান্টার্কটিকার সেই বরফ-শীতল একাকীত্বে মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে লিয়োনিড রোগোজভের এই অতিমানবিক কীর্তি আজও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অবিশ্বাস্য রূপকথা হয়ে রয়ে গিয়েছে।