আজকাল ওয়েবডেস্ক: ফের ভারতকে নিশানা পাক মন্ত্রীর। প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফের পর এবার উস্কানিমূলক মন্তব্য করলেন জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মুসাদ্দিক মালিক। পহেলগাঁও হামলারর পর 'সিন্ধু জল চুক্তি' বাতিল করেছে নয়াদিল্লি। ফলে প্রবল জলসঙ্কটে পাকিস্তান। এই অবস্থায় ভারতকে হাত কেটে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিলেন মুসাদ্দিক মালিক।
পাক জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মুসাদ্দিক মালিক ঘোষণা করেছেন যে, 'সিন্ধু জল চুক্তি'র আওতায় পাকিস্তানের প্রাপ্য অংশের ওপর যারা দাবি জানানোর চেষ্টা করবে, ইসলামাবাদ "সেই হাত কেটে ফেলবে"। পহেলগাঁও হামলার পর নয়াদিল্লি পদক্ষেপের জেরে কয়েক দশকের পুরনো এই জলবণ্টন চুক্তি নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। যা আরও উস্কে দিলেন মালিক।
তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারারের সঙ্গে যৌথ সংবাদিক বৈঠকে বক্তব্য রাখার সময় মুসাদ্দিক মালিক ভারতের বিরুদ্ধে জল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার অভিযোগ তোলেন এবং পাকিস্তানের জল-সংক্রান্ত অধিকার হুমকির মুখে পড়লে তার পরিণতি নিয়ে হুঁশিয়ারি দেন।
পাক সংবাদপত্র ‘ডন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মালিক বলেছেন, "একটি প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীর হাতে জলের একটি কল (ট্যাপ) নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। তিনি বলছেন যে, পাকিস্তানে এক ফোঁটাও জল আসতে দেবেন না। আমাদের জলের অংশের ওপর যারা দাবি জানাবে, আমরা তাদের সেই হাত কেটে ফেলব।"
পাকিস্তানের সম্প্রচারমাধ্যম ‘২৪নিউজএইচডি’ এবং আরও কয়েকটি সংবাদমাধ্যম তাঁর এই মন্তব্যের খবর প্রকাশ করে। অনলাইনে তাঁর বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপও ছড়িয়ে পড়ে।
মুসাদ্দিক মালিক 'সিন্ধু জল চুক্তি'র আওতায় পাকিস্তানের জলের অংশ সুরক্ষায় দেশটির দৃঢ় অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। বলেন যে, পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ জলের প্রবাহে ভারতকে কোনওভাবেই বাধা দিতে দেওয়া হবে না।
সিন্ধু চুক্তির পক্ষে পাকিস্তানের অবস্থান
সাংবাদিক বৈঠকে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন যে, সিন্ধু জল চুক্তিটি আইনত বাধ্যতামূলক এবং এটা একতরফাভাবে স্থগিত, বাতিল বা সংশোধন করা সম্ভব নয়। আতাউল্লাহ তারার বলেন, সিন্ধু জল চুক্তির বিষয়ে পাকিস্তানের অবস্থান আন্তর্জাতিক সমর্থন পেয়েছে এবং চুক্তি স্থগিত করার ভারতের পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে খুব একটা সমর্থন পায়নি। তিনি আরও বলেন, "সিন্ধু চুক্তিটি এখনও কার্যকর রয়েছে, কারণ কোনও মঞ্চেই ভারতের অবস্থান গৃহীত হয়নি।"
পাক তথ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির বারবার ঘোষণা করেছেন যে, "জল আমাদের জীবনরেখা, এবং সেই সঙ্গে আমাদের 'রেড লাইন' বা অলঙ্ঘনীয় সীমারেখা।"
‘ডন’-এর তথ্য অনুযায়ী, তারার যুক্তি দেন যে চুক্তির আওতায় পাকিস্তানের অধিকার আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত রয়েছে। তিনি বলেছেন, "আইনগতভাবে বলবৎযোগ্য একটি চুক্তির মাধ্যমে পানির ওপর আমাদের জনগণের অধিকার রয়েছে- যে চুক্তিটি উভয় দেশই মেনে নিয়েছিল এবং যা আজও কার্যকর রয়েছে।"
পাকিস্তানি মন্ত্রীরা ঘোষণা করেছেন যে, মঙ্গলবার ইসলামাবাদে 'সিন্ধু জল চুক্তি' বিষয়ক প্রথম আন্তর্জাতিক সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হবে। তারার জানান, এই সম্মেলনে যোগদানের জন্য আইনি বিশেষজ্ঞ, জল বিশেষজ্ঞ এবং বিদেশি প্রতিনিধিরা ইতিমধ্যেই পাকিস্তানে এসে পৌঁছেছেন।
তিনি বলেন, এই সেমিনারে চুক্তির আওতায় পাকিস্তানের আইনি অধিকার পর্যালোচনা করা হবে এবং এর কারিগরি ও আইনি দিকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
সিন্ধু চুক্তি নিয়ে বিরোধ
১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাঙ্কের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত 'সিন্ধু জল চুক্তি' মোতাবেক ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু নদ অববাহিকার জল বণ্টনের বিষয়টি নিয়ন্ত্রীত হয়। এই চুক্তির আওতায় ভারত পূর্বাঞ্চলীয় নদীগুলোর জল (রাভি, বিয়াস ও সতলজ) নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে পাকিস্তান পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর (সিন্ধু, ঝিলাম ও চন্দ্রভাগা)জলের সিংহভাগ ব্যবহার করে।
যুদ্ধ ও কয়েক দশকের উত্তেজনা সত্ত্বেও চুক্তিটি কার্যকর ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের এপ্রিলে পহেলগাঁওতে সন্ত্রাসবাদী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারত 'সিন্ধু জল চুক্তি' স্থগিত করেছে।
নয়াদিল্লি এই হামলার জন্য পাকিস্তান মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদীদের দায়ী করে এবং ঘোষণা করে যে, পাকিস্তান যতক্ষণ না পর্যন্ত আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদে সহায়তা দেওয়া "বিশ্বাসযোগ্য ও অপরিবর্তনীয়ভাবে" বন্ধ করছে, ততক্ষণ চুক্তিটি স্থগিত থাকবে। ইসলামাবাদ এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
পাকিস্তান বারবার ভারতের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে এবং আন্তঃসীমান্ত জল প্রবাহ পরিবর্তনের যেকোনও প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে।
এর আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফও সতর্ক করেছিলেন যে, জল নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে পাকিস্তান সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।
এআরওয়াই নিউজকে আসিফ বলেছিলেন, "যে মুহূর্তে আমরা অনুভব করব যে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা (এক্ষেত্রে জলও পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তারই একটি অংশ) হুমকির মুখে পড়েছে, তখনই আমরা ভারতের বিরুদ্ধে নিশ্চিতভাবেই যুদ্ধে জড়াব।"
চুক্তিটি সেকেলে বলে দাবি ভারতের
ভারত তার সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছে যে, বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে 'সিন্ধু জল চুক্তি' আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রাষ্ট্রসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ৬২তম অধিবেশনে বক্তব্য রাখার সময় রাষ্ট্রসংঘে ভারতের ফার্স্ট সেক্রেটারি অনুপমা সিং দাবি করেন, সন্ত্রাসবাদে মদত দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত কোনও দেশের পক্ষে এই চুক্তির আওতায় অব্যাহত সহযোগিতার আশা করা অযৌক্তিক। তিনি বলেছেন, "সিন্ধু জল চুক্তি নিয়ে আমাদের অবস্থান সবার জানা। এটা যুক্তিহীন যে, যে রাষ্ট্র নীতি হিসেবে সন্ত্রাস রপ্তানি করে, তারাই আবার সদিচ্ছা ও বন্ধুত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সহযোগিতার সুবিধা দাবি করে চলেছে।"
চুক্তিটিকে সেকেলে আখ্যা দিয়ে সিং আরও বলেন, "১৯৬০ সালে সম্পাদিত কোনও চুক্তিকে এমন কোনও চিরস্থায়ী অধিকার হিসেবে গণ্য করা যায় না যা জবাবদিহির ঊর্ধ্বে, বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কহীন এবং গত ছয় দশকের গভীর পরিবর্তনগুলোর প্রভাবমুক্ত।" তিনি পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক ফোরামে দ্বিপাক্ষিক বিরোধ উত্থাপনের পরিবর্তে নিজেদের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
ভারত বরাবরই বলে আসছে যে জম্মু ও কাশ্মীর "ভারতের অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজ্য অংশ ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।" পাশাপাশি ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে যে, তারা সন্ত্রাসবাদ ও নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরানোর জন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চগুলোকে ব্যবহার করছে।















